1. admin@avasmultimedia.com : Kaji Asad Bin Romjan : Kaji Asad Bin Romjan
অমুসলিমদের দেশে বসবাসের বিধান | Avas Multimedia অমুসলিমদের দেশে বসবাসের বিধান | Avas Multimedia
শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন

অমুসলিমদের দেশে বসবাসের বিধান

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময় : শুক্রবার, ২৮ মে, ২০২১
  • ১৭ বার দেখেছে
অমুসলিমদের দেশে বসবাসের বিধান
সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সাবেক সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] প্রদত্ত ফাতওয়া—
প্রশ্ন: অমুসলিমদের দেশে বসবাসের বিধান কী?
উত্তর: অমুসলিম-কাফিরদের দেশে বসবাস করা মুসলিমের দ্বীন, চরিত্র, চলাফেরা ও শিষ্টাচারের জন্য খুবই বিপজ্জনক। আমরা নিজেরা এবং আমরা ছাড়া আরও অনেকেই এটা প্রত্যক্ষ করেছি যে, যারা সেখানে বসবাসের জন্য গিয়েছে, তাদের অনেকেই বিপথগামী হয়েছে, ফলে তারা সেখানে যা নিয়ে গিয়েছিল, তার বিপরীত জিনিস নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছে। তারা সেখান থেকে পাপাচারী হয়ে এসেছে। এমনকি তাদের কেউ কেউ নিজের দ্বীন পরিত্যাগ করে সকল ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস (নাস্তিকতা) নিয়ে ফিরে এসেছে। আল-‘ইয়াযু বিল্লাহ (আল্লাহ’র কাছে এ থেকে পানাহ চাই)।
এক পর্যায়ে তারা নিরেট অবিশ্বাসের দিকে চলে যায় এবং ধর্ম ও পূর্ববর্তী-পরবর্তী ধর্মপালনকারীদের দিয়ে ঠাট্টাবিদ্রুপ শুরু করে। তাই সকলের জন্য এ থেকে সতর্ক থাকা এবং এ জাতীয় ধ্বংসাত্মক বিষয়ে নিপাতিত হওয়া থেকে নিরোধকারী শর্ত আরোপ করা বাঞ্ছনীয়।
কাফির রাষ্ট্রে বসবাসের জন্য অবশ্যই দুটো প্রধান শর্ত পূরণ হতে হবে। যথা:
প্রথম শর্ত: বসবাসকারীকে স্বীয় দ্বীনের ব্যাপারে আশঙ্কামুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ তার এমন ‘ইলম, ঈমান ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে, যা তাকে দ্বীনের ওপর অটল থাকার মতো এবং বক্রতা ও বিপথগামিতা থেকে বেঁচে থাকার মতো আত্মবিশ্বাসের জোগান দেয়। আর কাফিরদের প্রতি তার অন্তরে শত্রুতা ও বিদ্বেষ থাকতে হবে। অনুরূপভাবে কাফিরদের সাথে মিত্রতা ও তাদের প্রতি ভালোবাসা থেকে তাকে দূরে থাকতে হবে। কেননা তাদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করা এবং তাদেরকে ভালোবাসা ঈমানের পরিপন্থি।
মহান আল্লাহ বলেছেন, لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ “তুমি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোনো জাতিকে পাবে না, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বিরোধীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে; যদিও তারা তাদের পিতা, অথবা পুত্র, অথবা ভাই, কিংবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়।” [সূরাহ মুজাদালাহ: ২২]
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ ۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ. فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَىٰ أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ ۚ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ “হে মু’মিনগণ, ইহুদি-খ্রিষ্টানদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে অবশ্যই তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না। সুতরাং তুমি দেখতে পাবে, যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তারা কাফিরদের মধ্যে (বন্ধুত্বের জন্য) ছুটছে। তারা বলে, ‘আমরা আশঙ্কা করছি যে, কোনো বিপদ আমাদেরকে আক্রান্ত করবে।’ অতঃপর হতে পারে আল্লাহ দান করবেন বিজয় কিংবা তাঁর পক্ষ থেকে এমন কিছু, যার ফলে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছে, তাতে লজ্জিত হবে।” [সূরাহ মা’ইদাহ: ৫১-৫২]
নাবী ﷺ বলেছেন, الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ “মানুষ যাকে ভালোবাসে, সে (পরকালে) তার সাথেই থাকবে।” [সাহীহ বুখারী, হা/৬১৬৯; সাহীহ মুসলিম, হা/২৬৪০]
আল্লাহ’র শত্রুদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা মুসলিমের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ। কেননা তাদেরকে ভালোবাসলে তাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করা এবং তাদের অনুসরণ করা, কিংবা কমপক্ষে তাদের কর্মের বিরোধিতা না করা—জরুরি হয়ে যায়। একারণে নাবী ﷺ বলেছেন, “মানুষ যাকে ভালোবাসে, সে (পরকালে) তার সাথেই থাকবে।”
দ্বিতীয় শর্ত: নিজের দ্বীনকে প্রকাশ করার মতো সক্ষমতা থাকতে হবে। অর্থাৎ, বসবাসকারী ব্যক্তি কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ইসলামের নিদর্শনাবলি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন। নামাজ, জুমু‘আহ ও জামা‘আত—যদি তার সাথে জামা‘আতে নামাজ ও জুমু‘আহ প্রতিষ্ঠা করার মতো কেউ থেকে থাকেন—প্রতিষ্ঠা করতে বাধাগ্রস্ত হবেন না। অনুরূপভাবে জাকাত, রোজা, হজ ও অন্যান্য শার‘ঈ নিদর্শন প্রতিষ্ঠা করতে বাধাগ্রস্ত হবেন না। যদি এসব কাজ করার সক্ষমতা না থাকে, তাহলে তখন হিজরত ওয়াজিব হয়ে যাওয়ার কারণে সেখানে বসবাস করা জায়েজ হবে না।
ইমাম ইবনু কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) “মুগনী” গ্রন্থের ৮ম খণ্ডের ৪৫৭ পৃষ্ঠায় হিজরতের ব্যাপারে মানুষের প্রকারভেদ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, “যার ওপর হিজরত করা ফরজ: যে ব্যক্তির হিজরত করার মতো সক্ষমতা আছে, আর তার জন্য স্বীয় দ্বীনকে প্রকাশ করা এবং কাফিরদের মধ্যে বাস করে দ্বীনের ওয়াজিব বিষয়াদি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না, সে ব্যক্তির ওপর হিজরত করা ওয়াজিব। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় যারা নিজেদের প্রতি জুলুমকারী, ফেরেশতারা তাদের জান কবজ করার সময় বলে, ‘তোমরা কী অবস্থায় ছিলে?’ তারা বলে, ‘আমরা জমিনে দুর্বল ছিলাম।’ ফেরেশতারা বলে, ‘আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা তাতে হিজরত করতে?’ সুতরাং ওরাই তারা, যাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম। আর তা মন্দ প্রত্যাবর্তনস্থল।” (সূরাহ নিসা: ৯৭) এটা হলো কঠিন হুঁশিয়ারি, যা হিজরতের আবশ্যকিয়তা প্রমাণ করে। কেননা দ্বীনের আবশ্যকীয় বিষয় পালন করা প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব। হিজরত একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব; এটি এমন একটি বিধান, যা আবশ্যকীয় কর্মাবলিকে পূর্ণতা দান করে। আর যা ব্যতিরেকে ওয়াজিব কাজ পূর্ণ হয় না, সেটাও ওয়াজিব।” [উদ্ধৃতি সমাপ্ত]
উল্লিখিত প্রধান শর্ত দুটি পূরণ হওয়ার পর কাফির রাষ্ট্রে বসবাস করার বিষয়টিকে কয়েক প্রকারে বিভক্ত করা যায়। যথা:
প্রথম প্রকার: ইসলামের দিকে দা‘ওয়াত এবং ইসলামের প্রতি উৎসাহ প্রদানের জন্য বসবাস করা। এটি এক প্রকার জিহাদ। সক্ষম ব্যক্তির ওপর এ কাজ করা ফরজে কিফায়াহ (যে ফরজ কতিপয় আদায় করলে বাকিদের ওপর থেকে তা আদায় না করার পাপ ঝরে যায় – অনুবাদক)। তবে শর্ত হলো—দা‘ওয়াত বাস্তবায়িত হতে হবে এবং দা‘ওয়াত প্রদান ও গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকা যাবে না। কেননা ইসলামের দিকে দা‘ওয়াত দেওয়া দ্বীনের আবশ্যকীয় বিধিবিধানের অন্তর্ভুক্ত। আর এটিই রাসূলগণের পথ। নাবী ﷺ সর্ব জায়গা ও সর্ব সময়ে ইসলামের তাবলীগ (প্রচার) করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ﷺ বলেছেন, بَلِّغُوْا عَنِّى وَلَوْ اَيَةً “আমার পক্ষ হতে (মানুষের কাছে) একটি বাক্য হলেও পৌঁছিয়ে দাও।” [সাহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১]
দ্বিতীয় প্রকার: কাফিরদের অবস্থা পর্যালোচনা করার জন্য এবং তারা যে ভ্রান্ত ‘আক্বীদাহ, বাতিল ইবাদত, নষ্ট চরিত্র ও নৈরাজ্যপূর্ণ চলাফেরার ওপর রয়েছে—তা জানার জন্য সেখানে অবস্থান করা। যাতে করে মানুষকে তাদের মাধ্যমে ধোঁকাগ্রস্ত হওয়া থেকে সতর্ক করা যায়, আর যারা তাদেরকে ভালো মনে করে, তাদের কাছে ওদের প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করা যায়। এ ধরনের বসবাসও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এর মাধ্যমে কুফর ও কাফিরদের থেকে সতর্ক করা হয়, যা ইসলাম ও তার আদর্শের প্রতি উৎসাহপ্রদানের মতো বিষয়কে ধারণ করে। কেননা কুফরির অনিষ্টতাই ইসলামের সঠিকতার প্রমাণ। তাইতো বলা হয়, “বস্তুর প্রকৃতত্ব তার বিপরীত বিষয়ের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়।”
কিন্তু এক্ষেত্রেও একটি অবশ্য পালনীয় শর্ত আছে। আর তা হলো—ওই কাজের ভালো ফলের চেয়ে বড়ো কোনো ক্ষতির আনয়ন ব্যতিরেকেই উক্ত কাজের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হতে হবে। যদি উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত না হয়, তথা কাফিররা যে মতাদর্শের ওপর রয়েছে তা প্রচার করতে এবং তা থেকে সতর্ক করতে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে সেখানে অবস্থান করার কোনো ফায়দা নেই। আবার যদি উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হওয়ার সাথে সাথে তার চেয়ে বড়ো কোনো ক্ষতি অর্জিত হয়, তাহলে উক্ত কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। যেমন: কাফিররা প্রচারকারী ব্যক্তির কাজের মোকাবেলায় ইসলামকে এবং ইসলামের রাসূল ও ইমামগণকে গালিগালাজ করা শুরু করল (তাহলে উক্ত কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক)।
যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ ۗ كَذَٰلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّهِمْ مَرْجِعُهُمْ فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ “আর তোমরা তাদেরকে গালি দিয়ো না, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তারা আহ্বান করে, ফলে তারা বিদ্বেষ ও অজ্ঞতাবশত গালি দিবে আল্লাহকে। এভাবেই আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য তাদের কর্মকে শোভিত করেছি। তারপর তাদের রবের কাছেই তাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দিবেন।” [সূরাহ আন‘আম: ১০৮]
এই প্রকারটি কাফির রাষ্ট্রে মুসলিমদের গুপ্তচর হিসেবে অবস্থান করার মতো। যাতে সে জানতে পারে যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে তারা কী গুপ্ত ষড়যন্ত্র করছে, ফলে তাদের থেকে মুসলিমরা সতর্ক থাকতে পারে। যেমন নাবী ﷺ খন্দক যুদ্ধে হুযাইফাহ ইবনুল ইয়ামান (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) কে মুশরিকদের কাছে পাঠিয়েছিলেন, তাদের খবর জানার জন্য।
তৃতীয় প্রকার: মুসলিম রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং কাফির রাষ্ট্রের সাথে মুসলিম রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রাখতে সেখানে বসবাস করা। যেমন: দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ। এক্ষেত্রে যে কাজের জন্য এখানে অবস্থান করতে হচ্ছে, সে কাজের বিধান যা, এখানে বসবাসের বিধানও তা। উদাহরণস্বরূপ কোনো কালচারাল অ্যাটাশে ছাত্রদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করার জন্য এবং তাদেরকে ইসলাম ধর্ম এবং ইসলামে বর্ণিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শিষ্টাচার পালন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার জন্য সেখানে বসবাস করছেন। তাঁর সেখানে বসবাস করার ফলে অর্জিত হয় বিরাট কল্যাণ এবং নিশ্চিহ্ন হয় বড়ো ধরনের অকল্যাণ।
চতুর্থ প্রকার: কোনো বিশেষ বৈধ কাজের জন্য বসবাস করা। যেমন: ব্যবসা, চিকিৎসা প্রভৃতি। এক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী বসবাস করা জায়েজ। ‘আলিমগণ (রাহিমাহুল্লাহ) ব্যবসা করার জন্য কাফির রাষ্ট্রে প্রবেশ করা বৈধ—বলে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন এবং তাঁরা বিষয়টি কিছু সাহাবী (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) থেকেও বর্ণনা করেছেন।
পঞ্চম প্রকার: পড়াশোনার জন্য বসবাস করা। এটি পূর্বোক্ত—প্রয়োজন অনুযায়ী বসবাস করা বৈধ—প্রকারটির‌ই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটি বসবাসকারীর দ্বীন ও আখলাকের জন্য পূর্বোক্ত বিষয়ের চেয়েও বিপজ্জনক ও ভয়াবহ। কেননা এতে ছাত্র নিজের নিচু মর্যাদা এবং তার শিক্ষকদের উঁচু মর্যাদা অনুভব করে। ফলে সে তাদেরকে শ্রদ্ধা করে এবং তাদের মতাদর্শ ও লাইফ স্টাইলে পরিতুষ্ট হয়। এক পর্যায়ে সে তাদের অনুকরণ শুরু করে। আল্লাহ যাকে হেফাজত করতে চান, সে ছাড়া কেউ এ থেকে বাঁচতে পারে না; আর তাদের (বেঁচে যাওয়া ছাত্রদের) সংখ্যা খুবই নগন্য।
এতদ্ব্যতীত ছাত্র স্বীয় শিক্ষকের কাছে নিজের প্রয়োজন অনুভব করে, যা তাকে (কাফির) শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা এবং শিক্ষকের ভ্রষ্ট মতাদর্শের ব্যাপারে তাঁর মোসাহেবি করার দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়াও ছাত্র যে ছাত্রাবাসে থাকে, সেখানে তার সহপাঠীরাও থাকে। তাদের মধ্য থেকে সে কতিপয়কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে ভালোবাসে এবং তাদের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করে। এই প্রকার বসবাসের ভয়াবহতার কারণে এক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কে থাকা ওয়াজিব। তাই এক্ষেত্রে প্রধান শর্ত দুটোর পাশাপাশি আরও কিছু শর্ত যুক্ত হয়। যথা:
১ম শর্ত: ছাত্রকে বিবেকগত পক্বতার দিক থেকে উঁচু স্তরের হতে হবে, যার মাধমে সে কল্যাণকারী ও অকল্যাণকারীকে আলাদা করতে পারবে এবং অদূর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করতে পারবে। পক্ষান্তরে কমবয়সী এবং কম বুদ্ধিসম্পন্ন ছাত্রদেরকে কাফির রাষ্ট্রে পাঠানো তাদের দ্বীন, চরিত্র ও শিষ্টাচারের জন্য খুবই বিপজ্জনক। এরপর এটা তাদের জাতির লোকের জন্যও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যখন তারা নিজেদের জাতির কাছে ফিরে যায় এবং তাদের মধ্যে ওই বিষ উৎক্ষেপণ করে, যা সে ওই কাফিরদের নিকট থেকে পান করে এসেছে। যেমনটি ইতঃপূর্বে ঘটেছে এবং বাস্তবতাও এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। ওই সকল ছাত্রদের অনেকেই যা নিয়ে সেখানে গিয়েছিল, তার বিপরীত বিষয় নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছে। তারা তাদের ধার্মিকতা, চরিত্র ও শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে বিপথগামী হিসেবে ফিরে এসেছে। আর এসব ক্ষেত্রে তারা নিজেরা এবং তাদের সমাজ অর্জন করেছে ভয়াবহ অনিষ্ট, যা এখন সুবিদিত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে সেখানে পড়তে পাঠানো মূলত হিংস্র কুকুরের কাছে ভেড়ী বা দুম্বী পেশ করার নামান্তর।
২য় শর্ত: ছাত্রের এমন শার‘ঈ ‘ইলম থাকতে হবে, যার দ্বারা সে হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং হক দিয়ে বাতিলকে প্রতিহত করতে পারে। যাতে করে কাফিররা যে বাতিল মতাদর্শের ওপর আছে, সে তার দ্বারা ধোঁকাগ্রস্ত হয়ে ওই মতাদর্শকে হক মনে করে না বসে, অথবা তা তার কাছে গোলমেলে হয়ে না যায়, কিংবা তা প্রতিহত করতে ব্যর্থ না হয়। অন্যথায় সে দিশেহারা হয়ে যাবে, কিংবা বাতিলের অনুসরণ করতে শুরু করবে। হাদীসে বর্ণিত দু‘আয় বলা হয়েছে, اللهم أرني الحق حقاً وارزقني اتباعه، وأرني الباطل باطلاً وارزقني اجتنابه، ولا تجعله ملتبساً علي فأضل “হে আল্লাহ, আপনি আমার কাছে হককে হক হিসেবেই দেখান এবং আমাকে তা অনুসরণ করার সামর্থ্য দিন। আপনি আমার কাছে বাতিলকে বাতিল হিসেবেই দেখান এবং আমাকে তা বর্জন করার সামর্থ্য দিন। আর আপনি বাতিলকে আমার ওপর গোলমেলে করে তুলিয়েন না, যার দরুন আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাই!”
৩য় শর্ত: ছাত্রের এমন ধার্মিকতা থাকতে হবে, যা তাকে হেফাজত করবে এবং যার মাধ্যমে সে কুফর ও পাপাচারিতা থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। ধর্মপালনে দুর্বল ব্যক্তির জন্য ওখানে বসবাস করা নিরাপদ নয়, তবে আল্লাহ যাকে নিরাপদ রাখতে চান তার কথা স্বতন্ত্র। কেননা ওখানে প্রতিরোধকারী দুর্বল, আর আক্রমণকারী শক্তিশালী। ওখানে কুফর ও পাপাচারিতার অসংখ্য শক্তিশালী মাধ্যম রয়েছে। যখন এসব মাধ্যম কোনো দুর্বল প্রতিরোধকারীর সম্মুখে এসে পড়ে, তখন সেগুলো তাদের কাজ করে চলে যায়।
৪র্থ শর্ত: সে যে বিদ্যা অর্জনের জন্য সেখানে বসবাস করছে, সেই বিদ্যার প্রয়োজন থাকতে হবে। যেমন ওই বিদ্যা অর্জনের মধ্যে মুসলিমদের কল্যাণ নিহিত থাকা এবং উক্ত বিদ্যার অস্তিত্ব মুসলিমদের দেশে না থাকা। কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত বিদ্যার অন্তর্ভুক্ত হয়, কিংবা সেই বিদ্যার অস্তিত্ব মুসলিম দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকে, তাহলে উক্ত বিদ্যা অর্জনের জন্য কাফির রাষ্ট্রে বসবাস করা জায়েজ নয়। যেহেতু সেখানে বসবাসের মধ্যে রয়েছে দ্বীন ও আখলাকের ক্ষতি এবং কোনো ফায়দা ছাড়াই বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপচয়।
ষষ্ঠ প্রকার: (স্থায়ীভাবে) বসবাসের জন্য অবস্থান করা। এটি পূর্বের প্রকারগুলোর চেয়ে বিপজ্জনক ও ভয়াবহ। কেননা এতে অনেক ক্ষতি রয়েছে। যেমন: কাফিরদের সাথে পূর্ণরূপে সংমিশ্রিত হওয়া, এবং তার এই উপলব্ধি হওয়া যে, সে একজন নাগরিক, যে কি না দেশ যা দাবি করে—তথা ভালোবাসা, মিত্রতা প্রভৃতি—তা মেনে চলে। এছাড়াও এতে রয়েছে কাফিরদের দল ভারি করার মতো ক্ষতিকর বিষয়। এরকম ব্যক্তি নিজের পরিবারকে কাফিরদের মধ্যে লালনপালন করে। ফলে তার পরিবারের সদস্যরা কাফিরদের চরিত্র ও সংস্কৃতির অনেক বিষয় গ্রহণ করে এবং কখনো কখনো ‘আক্বীদাহ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে তাদের অনুকরণও করে!
একারণে হাদীসে এসেছে, নাবী ﷺ বলেছেন, مَنْ جَامَعَ الْمُشْرِكَ وَسَكَنَ مَعَهُ فَإِنَّهُ مِثْلُهُ “যে ব্যক্তি কোনো মুশরিকের সাহচর্যে থাকে এবং তার সাথে বসবাস করে, সে মূলত তারই মতো।” [আবূ দাঊদ, হা/২৭৮৭; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]
এই হাদীস যদিও দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে, তথাপি এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আর তা হলো—একত্রে বসবাস একই রকম হওয়ার দিকে আহ্বান করে।
ক্বাইস বিন আবূ হাযিম থেকে বর্ণিত, তিনি জারীর বিন ‘আব্দুল্লাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নাবী ﷺ বলেছেন, أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ لِمَ؟ قَالَ: لَا تَرَاءَى نَارَاهُمَا “আমি ওই সকল মুসলিম থেকে দায়মুক্ত, যারা মুশরিকদের মধ্যে বসবাস করে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহ’র রাসূল, এরূপ কেন?’ তিনি বললেন, ‘যাতে করে তাদের দুজনের আগুনকে এক দৃষ্টিতে দেখা না যায়’।” [আবূ দাঊদ, হা/২৬৪৫; তিরমিযী, হা/১৬০৪; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আলবানী)]
অধিকাংশ রাবি (বর্ণনাকারী) হাদীসটিকে ক্বাইস বিন আবূ হাযিম কর্তৃক নাবী ﷺ থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, “আমি মুহাম্মাদকে—অর্থাৎ ইমাম বুখারীকে—বলতে শুনেছি, সঠিক কথা হলো নাবী ﷺ থেকে ক্বাইসের বর্ণিত হাদীসটি মুরসাল।”
তাহলে কীভাবে একজন মু’মিনের অন্তর কাফিরদের দেশে বসবাস করার প্রতি সম্মত হতে পারে? অথচ সেসব দেশে কুফরের নিদর্শনাবলি প্রকাশমান, সেসব দেশে শাসন করা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আইন ব্যতীত অন্য আইন দিয়ে! আর সে তার দু চোখ দিয়ে এসব দেখে, দু কান দিয়ে এসব শোনে, এবং তাতে সম্মত হয়। এমনকি সে ওই সকল দেশের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। সেসব দেশে সে স্বীয় পরিবার ও সন্তানসন্ততি নিয়ে বসবাস করে এবং সেসব দেশে শান্তি খুঁজে পায়, যেমনভাবে মুসলিমদের দেশে থেকে প্রশান্তি লাভ করা হয়। অথচ সেখানে বসবাস করা তার নিজের জন্য এবং তার পরিবারপরিজন ও সন্তানসন্ততির দ্বীন ও আখলাকের জন্য খুবই বিপজ্জনক।
কাফিরদের দেশে বসবাসের বিধানের আলোচনায় আমরা এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছি। আমরা আল্লাহ’র কাছে প্রার্থনা করি, যেন উক্ত সিদ্ধান্ত হক ও সঠিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
·
তথ্যসূত্র:
ইমাম ‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ), মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৫-৩০; দারুল ওয়াত্বান, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত; সন: ১৪১৩ (সর্বশেষ প্রকাশ)।
·
অনুবাদক: মুহাম্মাদ ‘আব্দুল্লাহ মৃধা

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মাধ‌্যমগুলোতে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর..

আজকের দিন-তারিখ

  • শনিবার (রাত ২:০৭)
  • ৩১শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • ২১শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি
  • ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)
© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত-২০২০-২০২১ ‍avasmultimedia.com
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD