1. admin@avasmultimedia.com : Kaji Asad Bin Romjan : Kaji Asad Bin Romjan
বিপদ-আপদ ও রোগ-ব্যাধি একজন মুমিনকে কোন পথে পরিচালিত করে? | Avas Multimedia বিপদ-আপদ ও রোগ-ব্যাধি একজন মুমিনকে কোন পথে পরিচালিত করে? | Avas Multimedia
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১০:৫৬ অপরাহ্ন

বিপদ-আপদ ও রোগ-ব্যাধি একজন মুমিনকে কোন পথে পরিচালিত করে?

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময় : বুধবার, ৩০ জুন, ২০২১
  • ১৭ বার দেখেছে

বিপদ-আপদ ও রোগ-ব্যাধি একজন মুমিনকে
কোন পথে পরিচালিত করে?

-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল*


عَنْ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ  مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ الْخَامَةِ مِنَ الزَّرْعِ تُفِيئُهَا الرِّيحُ وَتَصْرَعُهَا مَرَّةً وَتَعْدِلُهَا أُخْرَى حَتَّى تَهِيجَ وَمَثَلُ الْكَافِرِ كَمَثَلِ الأَرْزَةِ الْمُجْذِيَةِ عَلَى أَصْلِهَا لاَ يُفِيئُهَا شَىْءٌ حَتَّى يَكُونَ انْجِعَافُهَا مَرَّةً وَاحِدَةً.  رَوَاهُ مُسْلِمٌ

বাংলা অনুবাদ :

কা‘ব ইবনু মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তির উপমা হলো, সে শস্যক্ষেতের চারাগাছের কোমল অংশের ন্যায়, বাতাসের প্রবাহ যাকে একবার নুইয়ে দেয়, বাতাসের প্রবাহ থেমে গেলে আবার সে পুনরায় সোজা হয়ে যায়। আর মুনাফিক্বের দৃষ্টান্ত হলো কঠিনভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ানো সেই (পাইন) বৃক্ষের ন্যায়, যেটি সর্বদা দৃঢ়ভাবে সোজা হয়ে থাকে যতক্ষণ না প্রচণ্ড বাতাস তাকে সমূলে উপড়ে ফেলে’।[1]

শাব্দিক বিশ্লেষণ :

مَثَلٌ – দৃষ্টান্ত, উদাহারণ, اَلْخَامَةُ – শব্দটি মূলত  خَوَامَةٌছিল واو  কেألف  এ রূপান্তর করে خَامَةٌ করা হয়েছে। শস্যের নরম ও কোমল ডগা বা নতুন গজিয়ে উঠা কাণ্ডের নরম অংশ, اَلزَّرْعُ -শস্য,- تُفِيئُهَا  তাকে নুইয়ে দেয়, উঁচু অথবা নিচু করা, কোনো বস্তুকে বাতাসের ডানে বা বামে অথবা উপরে বা নিচে নুইয়ে দেওয়া, الرِّيحُ  -বাতাস,- تَصْرَعُهَا  তাকে নিচু করে বা নুইয়ে দেয়। বাতাস গাছের ডগাকে বা মগডালকে নুইয়ে নিম্নমুখী করে দেয়,- تَعْدِلُهَا  তাকে স্বস্থানে ফিরিয়ে আনে, পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনে, حَتَّى – যে পর্যন্ত না, এমনকি,تَهِيجُ  – শুকিয়ে যায় বা মরে যায়,- الأَرْزَةُ  খুব পরিচিত একটি বৃক্ষ, যাকে ইংরেজিতে পাইন গাছ এবং উর্দূতে একে সানবির বলে। الْمُجْذِيَةُ – সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত, খুব গভীরে প্রথিত,- أَصْلِهَا তার ভিত্তি বা উত্স, يَكُونُ – হয় বা হবে, انْجِعَافُهَا – মূলোত্পাটন বা সমূলে ধ্বংস হওয়া।

ব্যাখ্যা :

রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুবই সংক্ষিপ্ত ভাষায় দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে যা বুঝিয়েছেন, তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক। তিনি যুক্তিনির্ভর বস্তুকে বাস্তবভিত্তিক বস্তুর সাথে তুলনা করে জীবন্ত করে উপস্থাপন করেছেন। তিনি একটি অদৃশ্যমান বস্তুকে দৃশ্যমান বস্তুর সাথে তুলনা করে অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই রকম জীবন্ত ও প্রাণবন্ত দৃষ্টান্ত উপস্থাপন শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব, যাকে ব্যাপক অর্থবোধক সংক্ষিপ্ত বাক্য ব্যবহারের অলৌকিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং যার ভাষার স্পষ্টতা এবং বাক্যের আলংকারিক সৌন্দর্য অত্যন্ত মধুর ও দারুণ আকর্ষণীয়।

নবুঅতী ধারায় দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের বিচারে এটি সবচেয়ে তাৎপর্যবহ এবং অলংকারপূর্ণ দৃষ্টান্ত। যেখানে একজন মুমিনের অবস্থার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর বিপদের সম্মুখীন হওয়াকে একটি শস্যের সদ্য বেড়ে উঠা নরম ডগার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যাকে বাতাস আন্দোলিত করে। উদ্ভিদের ডগা সর্বদা বাতাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আন্দোলিত হয়, কখনোই এর ব্যতিক্রম হয় না। ফলে সে ভেঙেও যায় না বা ক্ষতিগ্রস্তও হয় না। আর বাতাসের প্রবাহ থেমে গেলে তা স্বস্থানে ফিরে আসে। এমনটা শুধু একজন মুমিনের জীবনেই ঘটে থাকে।

বিপদ-আপদ মানুষের স্বভাবসুলভ আচরণকে উন্মুক্ত করে দেয়, তার আত্মার অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে। শুধু আল্লাহর প্রতি ঈমানই বিপদাপদ বা পরীক্ষার ব্যর্থতা থেকে একজন মুমিনকে রক্ষা করতে পারে। বিপদাপদের মাধ্যমে একজন মুমিনের হৃদয় পরিশুদ্ধ ও পরিষ্কার হয়। তার ভাষা মধুর ও জিহ্বা সংযত হয়। বিপদাপদ তাকে বিনয়ী ও নম্র করে। মুমিন একবার বিপদগ্রস্ত হলে আবার পরক্ষণে তিনি বিপদ থেকে মুক্ত হন। তাঁর জীবন সর্বদা নিরাপত্তা কিংবা দূর্বিপাকের কবলে ঘুরপাক খেতে থাকে।

রোগ-শোক, বালা-মুছীবত, ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট, বিপদাপদ ইত্যাদি একজন মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কঠিন ব্যর্থতা, ভয়ানক বিপর্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি তাকে মোকাবিলা করতে হয় প্রতিনিয়ত। নানান সমস্যা, বহুবিধ প্রতিবন্ধকতা ও সীমাহীন বাধা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে। অপ্রাপ্তির বেদনা, হারানোর যন্ত্রণা ও পরাজয়ের গ্লানি তাকে বিচলিত করতে পারে না। ব্যক্তিগত বিপর্যয়, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অত্যাচার, রাষ্ট্রীয় যুলুম ইত্যাদিতে তিনি আহত হন না। কারণ, তিনি ভালো করে জনেন, এই সমস্ত প্রতিকূলতা তেমন একটা স্থায়ী হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘)হে মুমিনগণ!( যদি তোমরা ধৈর্যধারণ এবং আল্লাহকে ভয় করো, তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয় তারা যা কিছু করে, তার সবকিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে আছে’ (আলে-ইমরান, ৩/১২০)

এই বিপদাপদের কারণে তার পরকালীন জীবন বিপদমুক্ত হয় আর তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এই কারণে তিনি ধৈর্যধারণ করেন এবং ধৈর্যের পন্থা অবলম্বন করেন। আল্লামা ত্বীবী এখানে একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলছেন, এখানে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, একজন মুমিন আত্মাকে দুনিয়ার জীবন হতে একেবারে নির্লিপ্ত রাখেন। দুনিয়ার জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ-উপভোগ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেন। বিপদাপদে সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন এবং এটা বিশ্বাস করেন যে, তাকে পরকালীন জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কেননা পরকালীন জীবনই হচ্ছে তার স্থায়ী থাকার এবং সেখানেই অনন্তকালের জন্য বসবাসের জায়গা।[2] মোদ্দাকথা, একজন মুমিন কখনোই সমস্যামুক্ত বাধাহীন জীবনযাপন করতে পারেন না। দুনিয়ার জীবনের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তিনি ভোগ করতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা রূযী প্রশস্ত এবং (যার জন্য ইচ্ছা রূযী) সংকুচিত করেন। আর তারা (কাফের/মুশরিকরা) পার্থিব জীবনের প্রতি মুগ্ধ। পার্থিব জীবন তো পরকালের তুলনায় একেবারে নগণ্য বিষয়’ (আররা‘দ১৩/২৬)

রোগ-ব্যাধি মুমিনের ঈমানী পরীক্ষার কষ্টি পাথর। যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা সময়ে সময়ে রোগ-ব্যাধি, অসুখ-বিসুখ ইত্যাদি দিয়ে মুমিনের ঈমানী পরীক্ষা চলমান রাখবেন। পরীক্ষা বলতেই আতঙ্কের বিষয় মনে করা হলেও মুমিন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন, পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই। মৃত্যু যেমন অবধারিত সত্য, একে যেমন অস্বীকার করা যায় না। পরীক্ষা বা রোগ-ব্যাধিও তদ্রুপ মুমিন বান্দার জীবনে অবধারিত সত্য। একে প্রতিহত করার কোনো বিকল্প নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জীবনের ক্ষতি এবং ফল-ফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করব’ (আল-বাক্বারা, ২/১৫৫)। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘আমি তোমাদেরকে ভালো এবং মন্দ দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি’ (আল-আম্বিয়া, ২১/৩৫)

অত্যন্ত শক্ত ও দীর্ঘজীবী একটি গাছের সাথে একজন কাফের বা মুশরিককে তুলনা করা হয়েছে। এটি একটি পরিচিত গাছ। এর ইংরেজি নাম পাইন। এ জাতীয় বৃক্ষ অনেক লম্বা এবং প্রচণ্ড শক্ত হয়ে থাকে। এরা দীর্ঘ বয়স পেয়ে থাকে। এরা সহজে মরে না, তবে যখন মারা যায়, তখন সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। একজন কাফেরের জীবন ঠিক এমনটাই হয়ে থাকে। সে সম্পূর্ণটাই অপবিত্র থাকে। কোনো প্রকার বিপদাপদ তাকে স্পর্শ করে না। দুনিয়ার জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগের পথ তার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তাকে অবারিত আরাম-আয়েশ ও অফুরন্ত ভোগ-বিলাসের সুযোগ করে দেওয়া হয়, যাতে করে তার পরকালীন শাস্তি আরও কঠিন ও ব্যাপক হয়। পরকালীন জীবনে শাস্তি বৃদ্ধির ফলস্বরূপ দুনিয়ার জীবনে তার বিপদাপদ কমিয়ে তাকে পর্যাপ্ত অবকাশ লাভের সুযোগ করে দেওয়া হয়। তাদের অবস্থার বর্ণনায় আল্লাহ বলেন, ‘আপনি যদি তাদেরকে দেখেন, তাদের দেহাবয়ব আপনার নিকট আকর্ষণীয় মনে হবে, আর যদি তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শুনেন। মনে হয় যেন তারা প্রাচীরের কাঠ। প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিপক্ষের মনে করে। তারাই প্রকৃত শত্রু। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন’ (আল-মুনাফিকুন, ৬৩/৪)

একজন মুমিন আল্লাহ তাআলার ফয়সালার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য করেন। তিনি কখনই আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যান না বা কোনো শাস্তির কারণে তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন না, বরং তিনি ধৈর্যধারণ করেন এবং ছওয়াবের প্রত্যাশা করেন। আর এটাই হচ্ছে ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাসের প্রকৃত চাহিদা। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন যে, আল্লাহ তাআলার পরীক্ষা তার পরকালীন জীবনকে উন্নত করবে। ফলে দুনিয়ার জীবনের সকল বিপদাপদ এবং বালা-মুছীবত তার নিকট তুচ্ছ ও হালকা হয়ে যায়। এছাড়া আল্লাহর এমন কিছু বান্দা রয়েছেন, যারা তাঁর এমন নৈকট্য অর্জন করেন যে, যার কারণে তারা বিপদাপদকে উপভোগ্য মনে করেন এবং আরও বিপদাপদে আপতিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। মুমিনগণের বিপদাপদকে আলিঙ্গন করার অবস্থা বর্ণনা করে আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘যখন মুমিনগণ শত্রুবাহিনীকে দেখলেন, তখন বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাঁদের ঈমান ও আত্মতৃপ্তি আরো বৃদ্ধি পেয়ে গেল’ (আল-আহযাব, ৩৩/২২)

সামাজিক বিপদ, ব্যবসায়িক ব্যর্থতা, আর্থিক দৈন্যতা ইত্যাদি একজন মুমিনের মনোবলকে দৃঢ় করে। চরম অর্থসংকট ও সামান্য অবৈধ প্রাপ্তি তাকে অন্যায় কাজ করতে প্রলুব্ধ করতে পারে না। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘মুমিনের প্রত্যেকটি কর্মই দারুণ চমত্কার। তাঁর (জীবনের) এমন কোনো ঘটনা নেই, যার মধ্যে কল্যাণ নিহিত নেই। আর এমনটি শুধু একজন মুমিনের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। যদি তার জীবনে সাফল্য আসে, তখন তিনি আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ফলে এটি তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তাঁর জীবনে ব্যর্থতা আসে, তখন তিনি ধৈর্যধারণ করেন। ফলে এটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়’।[3]

অবৈধ প্রলোভন, হারাম প্রদর্শনী, অন্যায় আবেদন ইত্যাদি তাঁকে পাপের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে না। সামাজিক অনাচার, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও নৈতিক অবক্ষয় ইত্যাদি তাকে স্পর্শ করতে পারে না। বরং ইসলামী আদর্শের অনুসরণ, আত্মার উন্নতিসাধন, কল্যাণমূলক কাজের অনুপ্রেরণা সর্বদা তাকে ধৈর্যশীল, আত্মসংযমী ও কল্যাণমুখী করে গড়ে তোলে। লোক্বমান (আলাইহিস সালাম) তাঁর সন্তানকে ধৈর্যের যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তার বর্ণনায় আল্লাহ বলেন, ‘হে বৎস! বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করো, নিশ্চয় এটা সাহসিকতাপূর্ণ কাজ’ (লোক্বমান, ৩১/১৭)

নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ভুল, সংঘটিত পাপ ইত্যাদিকে একজন মুমিন পর্যালোচনা করেন এবং ভুলগুলো সংশোধন করে নিজেকে সত্যের পথে পরিচালিত করেন। ঈমানের আলোকে আলোকিত হয়ে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে পবিত্রতার পথে অগ্রসর হন তিনি। পরকালীন জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করার জন্য তিনি সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন, যে তার নিজের আত্মপর্যালোচনা করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য (নেক) আমল করে। আর ঐ লোক দুর্বল, যে স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, আর আল্লাহর নিকট অবাস্তব আশা পোষণ করে।[4]

কোনো বিপদাপদে একজন মুমিন আতঙ্কিত হন না। তিনি বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করেন। কেননা তিনি জানেন, রোগ-ব্যাধি ও বালা-মুছীবত মুমিনের জন্য রহমত। তিনি মনে করেন, প্রত্যেকটি বালা-মুছীবত কিংবা রোগ-ব্যাধি আসার পিছনে কোনো না কোনো রহস্য লুক্কায়িত থাকে, যা সাধারণ মানুষ অনুধাবন করতে পারে না। কিন্তু একজন মুমিন ঠিকই তা অনুধাবন করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা অহেতুক কোনো কাজ করেন না। অন্যায়ভাবে তিনি বান্দার উপর কোনো শাস্তি চাপিয়ে দেন না। রোগ-ব্যাধি প্রদান করে তিনি বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘মুসলিমদের উপর যে সকল যাতনা, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আপতিত হয়, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এসবের দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন’।[5] ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘একজন মুসলিমকে কোনো রোগ-ব্যাধি বা অন্য বিপদাপদ আক্রমণ করে না, কিন্তু আল্লাহ তার পাপসমূহ ঐভাবে মিটিয়ে দেন, যেমনভাবে (শীতকালে) গাছের পাতা ঝরে যায়’।[6]

বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদিকে আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষ কল্যাণ ও অফুরন্ত পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে পথ চলেন। এভাবেই একজন মুমিন নিজের জীবনকে করেন ধন্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন তারা বিপদে আপতিত হয়, তখন বলে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রজেঊন (ইহা অবশ্যই আল্লাহর জন্যই ঘটেছে এবং আবশ্যই আমরা আল্লাহর নিকট ফিরে যাব)। তারা সেই সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এরা ওরাই, যারা হেদায়াতপ্রাপ্ত (আল-বাক্বারা২/১৫৬-৫৭)

দুনিয়াতে যত ধরনের রোগ-ব্যাধি রয়েছে, আল্লাহ তাআলাই মানুষকে প্রত্যেকটি রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। এমন কোনো রোগ-ব্যাধি নেই, যে চিকিৎসা পদ্ধতি তিনি মানুষকে শিক্ষা দেননি। রোগ-ব্যাধি যেমন তিনি দিয়ে থাকেন, রোগ মুক্তির ব্যবস্থাও তিনি দিয়েছেন। তিনিই আমাদের একমাত্র প্রতিপালক। তিনি ছাড়া রোগমুক্তিদাতা কেউ নেই। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার নিরাময়ের উপকরণ তিনি সৃষ্টি করেননি’।[7] আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)  থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেন, তা হচ্ছে আল্লাহর এক প্রকার আযাব। যাকে ইচ্ছা আল্লাহ তার উপর প্রেরণ করেন। তবে আল্লাহ মুমিনের জন্য একে রহমত বানিয়ে দিয়েছেন’।[8] রোগ-ব্যাধির প্রাদূর্ভাবের সময় মুমিনদেরকে কখনো হতাশ হওয়া যাবে না। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা হতোদ্যম হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরা যদি ঈমানদার হও, তাহলে তোমরা বিজয়ী হবে’ (আলে-ইমরান, ৩/১৩৯)। ‘আমি যখন মানুষদের অনুগ্রহ আস্বাদন করাই, তখন তারা তাতে খুশি হয়; আবার যখন তাদেরই (মন্দ) কাজের কারণে তাদের উপর কোনো মুছীবত পতিত হয়, তখন তারা সাথে সাথেই নিরাশ হয়ে পড়ে’ (আর-রূম, ৩০/৩৬)। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিপদাপদকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা দিন। গভীর বিপদ, ভয়াবহ বিপর্যয়, কঠিন রোগ-ব্যাধিকে প্রকৃত রহমত ও অফুরন্ত কল্যাণ লাভের মাধ্যম মনে করতে পারি সেই তাওফীক্ব আল্লাহ আমাদেরকে দান করুন। এমন রোগ-ব্যাধি, বালা-মুছীবত ও মহামারি থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন, যা আমরা সহ্য করতে পারব না বা যেগুলোকে আমরা শাস্তি বা আযাব বলে মনে করব- আমীন! ছুম্মা আমীন!


* প্রভাষক, বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, বরিশাল।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৮১০।

[2]. শারফুদ্দীন হুসাইন ইবনু আব্দুল্লাহ ত্বীবী, কাশিফ মিন হাক্বাইক্বিস সুনান।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৯৯।

[4]. তিরমিযী, হা/২৪৫৭, তিরমিযী হাদীছটিকে হাসান বললেও অন্যরা হাদীছটিকে দুর্বল বলেছেন।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২৩৯।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৭১।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭৬।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩২।

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মাধ‌্যমগুলোতে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর..

আজকের দিন-তারিখ

  • বৃহস্পতিবার (রাত ১০:৫৬)
  • ২৯শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৯শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি
  • ১৪ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)
© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত-২০২০-২০২১ ‍avasmultimedia.com
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD