মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ০৩:৩৩ অপরাহ্ন

শায়খ আবদুর রাযযাক বিন ইউসুফের বিভিন্ন ফতোয়ার উপর আরোপিত অভিযোগের জবাব-১
কাজী আসাদ বিন রমজান / ৫৯৮ কত বার
আপডেট: মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০২২

শায়খ আবদুর রাযযাক বিন ইউসুফের বিভিন্ন ফতোয়ার উপর আরোপিত অভিযোগের জবাব-১

✏️নিকট অতীতের দুই-তিন বছর থেকে অনলাইনের কিছু জ্ঞানপিপাসু দ্বীনী ভাই ও বোন শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফের কিছু ফতোয়া ও আক্বীদা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসতেছেন। বিভিন্ন নতুন নতুন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সেই পুরাতন বিষয়গুলো পূণরায় ঘুরে-ফিরে আলোচিত হয়। অনেকেই আগ-বাড়িয়ে শায়খকে তার ফতোয়া থেকে রুজু করার জোর দাবী পেশ করেন। আবার অনেকেই আদবের সীমা ছাড়িয়ে ও ইলমের সাথে খিয়ানত করে তার মানহাজ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পিছপা হয়না। বক্ষমান প্রবন্ধে শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফের ফতোয়াকে সঠিক প্রমাণ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সমালোচনাকারীগণ কোথায় সমালোচনা করতে আদবের সীমালংঘন করেছেন, কোথায় ইলমী খিয়ানত করেছেন এবং কিভাবে শায়খের উপর মিথ্যাচার করেছেন তার চিত্র ফুটিয়ে তোলা। কেননা এক তরফা সমালোচনার কারণে শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফের সাথে ইনসাফ হচ্ছেনা। আমরা বক্ষমান প্রবন্ধে সমালোচনার ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চাই।

⭕️প্রথমত: সমালোচনাকারীদের কিছু ভুল মানহাজ

🛑রুজু করতে হবে: সমালোচনাকারীগণ সবচেয়ে বড় ভুলটা যে জায়গায় করতেছে সেটা হচ্ছে তারা বারবার রুজু করার দাবী জানাচ্ছে। তাদের দাবীতে বুঝা যাচ্ছে কোন আলেমের সাথে একমত না হতে পারলে সেই আলেমকে তার মত থেকে ফিরে আসতে বাধ্য করা শরীয়ত সম্মত। অথচ উক্ত দাবী সালাফে সালেহীনের মানহাজের সম্পূর্ণ বিপরীত। কত ইমাম একই সময়ে একই মাসালায় মতভেদ করেছেন এবং কেউই রুজু না করে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। জবাব পাল্টা জবাব লিখতে লিখতে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন তার ইয়ত্তা নাই। ইবনু হাজার আসক্বালানী রহ:-এর ফাতহুল বারী প্রকাশের পর আল্লামা আইনী রহ: উমদাতুল কারীতে ফাতহুল বারীর অনেক ভুল ধরেন। ইবনু হাজার আসক্বালানী রহ: পূণরায় তার জবাবে ইন্তিকাযুল ইতিরায গ্রন্থ লিখেন। এভাবে অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে।

সত্যি বলতে কি! ফতোয়া না মিলার কারণে কোন আলেমকে রুজু করার জোরপূর্বক দাবী জানানো মূলত খারেজীদের স্বভাব। যারা ফতোয়ার সাথে দ্বিমত করলে মানুষকে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। যারা এই ধরণের খারেজী মানহাজ ভিতরে পোষণ করে তাদের থেকে সালাফী মানহাজের যুবকদের সতর্ক থাকা উচিৎ।

🛑সউদীর আলেমগণের ফতোয়ার সাথে না মিললে ভুল: আসলে কোন ফতোয়া ভুল হওয়ার মানদন্ড কি? শায়খ বিন বায, শায়খ সলিহ আল-উসাইমিন রহিমাহুমাল্লাহর ফতোয়ার সাথে না মিলাই কি কোন ফতোয়ার ভুল হওয়ার জন্য যথেষ্ট? যারা সমালোচনা করছেন তাদের রাদ্দ পর্যবেক্ষন করলে বুঝা যায় তারা এটাকেই ফতোয়া ভুল হওয়ার জন্য মানদন্ড বানিয়ে নিয়েছে। যা সম্পূর্ণরুপে সালাফে সালেহীনের মানহাজের বিপরীত। যেখানে স্বয়ং শায়খ বিন বায ও শায়খ সলিহ আল-উসাইমিন রহিমাহুমাল্লাহর পরস্পরের অসংখ্য ফতোয়ায় অমিল রয়েছে। এই বিষয়ে আল-ইজায নামে আলাদা একটি গ্রন্থই রচিত হয়েছে। আজকের যুগের সউদীর শায়খগণ শুধু নন কোন যুগের কোন নির্দিষ্ট আলেমের ফতোয়ার সাথে না মিলা মানে ফতোয়া ভুল হওয়া নয়। কেননা এই দ্বীনের মধ্যে একমাত্র নির্ভুল ব্যক্তি শুধুমাত্র যার কথা সঠিক -বেঠিকের মানদন্ড তিনি মুহাম্মাদ ছা:। বাকী সকলের কথা ভুলও হতে পারে সঠিকও হতে পারে।

🛑দ্বিমুখী আচরণ ও ফিক্বহী বিষয়ে কঠোরতা: যারা সমালোচনা করতেছেন তাদের সবচেয়ে বড় একটা এজেন্ডা হচ্ছে শায়খ নিজের ফতোয়াকে সবসময় চুড়ান্ত সঠিক মনে করেন। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে, সমালোচনাকারীগণই এই রোগে আক্রান্ত। তাদের লেখনীর দাবী প্রমাণ করে, একমাত্র তাদের ফতোয়াই ঠিক। এই ফতোয়ার বিপরীত কোন ফতোয়া দুনিয়াতে থাকতে পারেনা। তাদেরটাই চুড়ান্ত সঠিক। অথচ সালাফে সালেহীনের মানহাজ হচ্ছে একই সময়ে বিভিন্ন ফতোয়া থাকতে পারে। ফিক্বহী মাসায়েলগুলোতে মতভেদের প্রশস্ততা রয়েছে। সেক্ষেত্রে শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফও দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। ছাহাবীগণের যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ফিক্বহী মাসায়েলে মতভেদ ছিল আছে থাকবে।

🛑 ফতোয়ায় মতভিন্নতা মানে কি মানহাজে ভুল: সমালোচনাকারীগণ চতুর্থ যে বড় ভুলটি করতেছে তা হচ্ছে ফতোয়ার মতভিন্নতাকে ফতোয়ার ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করে সেটাকে বাতিল মানহাজের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেছে। অথচ মানুষের আক্বীদা যতক্ষণ সঠিক আছে ততক্ষণ সে সঠিক মানহাজের উপরেই রয়েছে। এটাই সালাফে সালেহীনের মানহাজ। এই জন্য সালাফে সালেহীনের মধ্যে মাসায়েলগত শত মতভেদ থাকলেও তারা সকলেই পরস্পরকে আহলুস সুন্নাহর আলেম বলে সম্বোধন করেছেন। মাসায়েলগত মতভেদের কারণে কাউকে মানহাজ থেকে বের করে দেয়া মূলত খারেজীদের স্বভাব। যারা সামান্য ফতোয়ার অমিলের কারণে মানুষকে কাফের পর্যন্ত বলতে পারে। সুতরাং এই ধরণের খারিজিয়্যাত ঘেষা মানহাজ থেকে সালাফী মানহাজের যুবকদের সতর্ক থাকা উচিৎ।

⭕️দ্বিতীয়ত: শায়খের উপর কিছু মিথ্যাচার
শায়খের ভুল ধরতে গিয়ে কিছু ভাই সজ্ঞানে হোক অথবা বিদাতীদের অনুসরণে হোক কিছু কিছু ক্ষেত্রে চরম মিথ্যাচার করেছেন। তার কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে পেশ করা হলো।

🛑পেশাব করা অবস্থায় সালাম দিতে হবে:
বিদাতীরা বহু আগে থেকে শায়খের নামে একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়ায় যে, শায়খ নাকি পেশাব পায়খানা করা অবস্থায় সালাম দেয়া যাবে মর্মে ফতোয়া দিয়েছেন। নাউজুবিল্লাহ এটি একটি ডাহা মিথ্যাচার। শায়খ মূলত এখানে যাকে সালাম দেয়া হবে তার অবস্থা বর্ণনা করেছেন সালাম দানকারীর অবস্থা নয়। তথা যাকে সালাম দেয়া হবে সে যদি খাদ্য গ্রহণরত অবস্থায় থাকে অথবা পেশাব পায়খানারত অবস্থায় থাকে তবুও তাকে সালাম দেওয়া যাবে। আমরা জানি আমাদের দেশে কেউ খাবার গ্রহণরত অবস্থায় থাকলে তাকে সালাম দেয়া ঠিক মনে করা হয়না। তখন সালামদানকারী বলে যে, আপনারা খাচ্ছেন তাই সালাম দিলাম না। এই নোংরা নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে শায়খ বলেছেন যাকে সালাম দেয়া হবে সে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন তাকে সালাম দেয়া যাবে। তার এই সহজ ও সঠিক কথার অর্থ কখনোই এটা নয় যে, সালামদানকারী পেশাবরত অবস্থায় বাথরুমে থেকে অন্যকে সালাম দিবে। নাউজুবিল্লাহ যেখানে শায়খ নিজে পেশাব পায়খানার আদবের বহু বক্তব্যে পেশাব-পায়খানায় থাকা অবস্থায় কথা বলা নিষেধ মর্মে অসংখ্য বক্তব্য দিয়েছেন। যারাই শায়খের সালামের উপর পূর্ণ বক্তব্য শুনবেন তারা দেখবেন তিনি শুধু সালামের উপর কত অসংখ্য হাদীছ পেশ করে সালামের আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি সেই হাদীছও বলেছেন যেখানে, রাসূল ছা:কে জনৈক ব্যক্তি সালাম দিলো এমতবস্থায় রাসূল ছা: পেশাবরত ছিলেন। তিনি পেশাব শেষ করে উঠে এসে তায়াম্মুম করে অতপর সালামের উত্তর দিয়েছেন। (আবু দাউদ হা/১৬) তিনি এই হাদীছ দিয়েই দলীল দিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তি পেশাবরত থাকলেও তাকে সালাম দেয়া যায়। অথচ এই হাদীছ এটাও প্রমাণ করে যে, পেশাবরত অবস্থায় সালামের উত্তর দেয়া যায়না। যেখানে পেশাবরত অবস্থায় উত্তর দেয়া যায়না সেখানে কিভাবে পেশাবরত অবস্থায় কেউ অন্য কাউকে সালাম দিতে পারে। এটা যেকোন সাধারণ মুসলিম জানে যে, পেশাব-পায়খানায় থাকা অবস্থায় কথা বলতে হয়না সেখানে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা তো বহু দূরের কথা। নাউজুবিল্লাহ। এই রকম একটি সাধারণ কমন সেন্সের মাসালাকে নিয়ে শুধুমাত্র হিংসার বশবর্তী হয়ে শায়খের নাম ইতিহাসের ভয়ংকরতম মিথ্যাচার করা হয়েছে। এই মিথ্যাচারের জবাব একদিন মহান আল্লাহ করবেন। পূর্ণ আলোচনা না শুনে সামান্য কাটিং দিয়ে সম্পূর্ণরুপে একটি মিথ্যা কথাকে শায়খের দিকে নিসবাত করা হয়েছে। ওয়াল ইয়াজু বিল্লাহ। হাদাহুমুল্লাহ!

(চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর..
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট