1. admin@avasmultimedia.com : Kaji Asad Bin Romjan : Kaji Asad Bin Romjan
সাকীনাহ : প্রশান্তি লাভের পবিত্র অনুভূতি -আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ - Avas Multimedia সাকীনাহ : প্রশান্তি লাভের পবিত্র অনুভূতি -আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ - Avas Multimedia
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২, ০৭:১১ অপরাহ্ন

সাকীনাহ : প্রশান্তি লাভের পবিত্র অনুভূতি -আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ

কাজী আসাদ বিন রমজান
  • আপডেটের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন, ২০২২
  • ৯ বার

সাকীনাহ : প্রশান্তি লাভের পবিত্র অনুভূতি
আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ – আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভূমিকা :

জীবনের প্রকৃত সুখ-শান্তির ষোল আনাই নির্ভর করে মানসিক প্রশান্তির ওপর। আত্মিক প্রশান্তি না থাকলে পৃথিবীর কোন কিছুই মানুষকে সুখী করতে পারে না। টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, ক্ষমতা-প্রতিপত্তি যতই থাকুক, মনের শান্তি না থাকলে সুখ পাওয়া কখনোই সম্ভব হয় না। এসির ঠান্ডা বাতাস মানুষের শরীর শীতল করতে পারে, কিন্তু তার অশান্ত হৃদয়কে কখনো প্রশান্ত করতে পারে না। সমস্যাসংকুল এই ধরণীতে মানুষ এক চিলতে শান্তির খোঁজে কত কিছুই না করে। ভোগবাদী মানুষেরা দুনিয়ার ভোগ্যসামগ্রীর মাঝে সুখ-শান্তি তালাশ করে। কিন্তু মুমিন বান্দারা আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের মাঝেই তার প্রশান্তির ঠিকানা খুঁজে নেয়। ছালাত, ছিয়াম, কুরআন তেলাওয়াত, দান-ছাদাক্বাহ করার মাধ্যমে সে যে প্রশান্তি অনুভব করে, বস্ত্তবাদী মানুষ কোটি টাকার বিনিময়েও সেটা লাভ করতে পারে না। এর কারণ হ’ল প্রশান্তি লাভের এই অনুভূতি আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের হৃদয় সমূহে এই পবিত্র অনুভূতি নাযিল করেন, যাকে আরবীতে ‘সাকীনাহ’ বলা হয়। যে হৃদয়ে সাকীনাহ নাযিল হয়, সে হৃদয়ে অস্থিরতা, হতাশা ও দুশ্চিন্তা ঠাঁই পায় না। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সকল প্রতিকূল পরিবেশে সেই হৃদয় শান্ত থাকে। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা সাকীনাহর স্বরূপ এবং তা লাভ করার উপায় সম্পর্কে আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।

সাকীনাহর পরিচয় :

সাকীনাহ (السَّكِينَةُ) আরবী শব্দ। যার অর্থ- প্রশান্তি, সান্ত্বনা, ধীরতা, স্থিরতা, মানসিক দৃঢ়তা, প্রশান্তিময় পবিত্র অনুভূতি। এর পারিভাষিক সংজ্ঞা দিয়ে হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, السَّكِينَةِ هِيَ الطُّمَأْنِينَةُ وَالْوَقَارُ، وَالسُّكُونُ الَّذِي يُنْزِلُهُ اللهُ فِي قَلْبِ عَبْدِهِ، عِنْدَ اضْطِرَابِهِ مِنْ شِدَّةِ الْمَخَاوِفِ. فَلَا يَنْزَعِجُ بَعْدَ ذَلِكَ لِمَا يَرِدُ عَلَيْهِ، وَيُوجِبُ لَهُ زِيَادَةُ الْإِيمَانِ، وَقُوَّةَ الْيَقِينِ وَالثَّبَاتِ، ‘সাকীনাহ হ’ল এক ধরনের প্রশান্তি, গাম্ভীর্যতা ও স্থিরতা, যা আল্লাহ তাঁর বান্দার হৃদয়ে নাযিল করেন যখন সে ভয়ে-উৎকণ্ঠায় ভীষণ অস্থির থাকে। ফলে তার উপর আপতিত পরিস্থিতে সে আর বিচলিত হয় না। উপরন্তু তার ঈমান, মানসিক শক্তি ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়’।[1] জুরজানী (রহঃ) বলেন,السكينة: ما يجده القلب من الطمأنينة عند تنزل الغيب، وهي نور في القلب يسكن إلى شاهده ويطمئن، ‘অদৃশ্যভাবে অবতীর্ণ যে প্রশান্তি হৃদয়ে অনুভূত হয়, সেটাই সাকীনাহ। এটা হৃদয়ে প্রক্ষিপ্ত আলো, যা লাভ করে ব্যক্তি স্বস্তি অনুভব করে এবং প্রশান্ত হয়’।[2] অর্থাৎ সাকীনাহ হচ্ছে একটি পবিত্র অনুভূতির নাম, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন বান্দার অস্থির হৃদয়ে অবতীর্ণ হয় এবং তার দেহ-মনে প্রশান্তির আবেশ ছড়িয়ে দেয়।

সাকীনাহর প্রকার ও ধরনসমূহ:

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) দুই প্রকার সাকীনাহর কথা আলোচনা করেছেন। প্রথমতঃ খাছ সাকীনাহ, যা নবী-রাসূলগণের প্রতি বিশেষভাবে বিশেষ মুহূর্তে নাযিল হয়। দ্বিতীয়তঃ আম সাকীনাহ, যা নবী-রাসূল ছাড়া মুমিন বান্দাদের প্রতি সাধারণভাবে নাযিল হয়।[3] এগুলোর আবার কয়েকটি ধরন রয়েছে। কুরআন ও হাদীছে আলোচিত সাকীনাহগুলো তিন ধরনের হয়ে থাকে। যথা-

১. বনু ইস্রাঈলের সাকীনাহ :

যখন আল্লাহ ত্বালূতকে বনু ইসরাঈলের রাজা নিযুক্ত করেন, তখন তারা ত্বালূতকে রাজা হিসাবে না মানার জন্য নানা ধরনের বাহানা করতে থাকে। সেকারণ আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে ত্বালূতের রাজত্বের নিদর্শন স্বরূপ একটি তাবূত বা সিন্দুক নাযিল করেন। সেই সিন্দুকের মধ্যে ছিল সাকীনাহ এবং মূসা ও হারূন (আঃ)-এর ব্যবহৃত বরকতময় কিছু জিনিষপত্র। যেমন আল্লাহ বলেন, وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ آيَةَ مُلْكِهِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ التَّابُوتُ فِيهِ سَكِينَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَبَقِيَّةٌ مِمَّا تَرَكَ آلُ مُوسَى وَآلُ هَارُونَ تَحْمِلُهُ الْمَلَائِكَةُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ، ‘তাদের নবী[4] তাদের বললেন, তার শাসক হবার নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকট সেই সিন্দুকটি সমাগত হবে, যাতে থাকবে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে প্রশান্তি এবং মূসা ও হারূণ পরিবারের পরিত্যক্ত বস্ত্তসমূহ। ফেরেশতাগণ ওটি বহন করে আনবে। নিশ্চয়ই এর মধ্যে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’ (বাক্বারাহ ২/২৪৮)।

বনু ইসরাঈলদের উপর নাযিলকৃত এই সাকীনাহ ছিল বস্ত্তগত এবং স্থানান্তরযোগ্য; এটা হৃদয়ে নাযিল হয়নি। তবে সিন্দুকের মাধ্যমে অবতীর্ণ হ’লেও এটা তাদের হৃদয়কে প্রভাবিত করেছিল। ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, সাকীনাহ বহনকারী সেই সিন্দুক নাযিলের পরে বনু ইসরাঈলদের হৃদয় সমূহ প্রশান্ত হয়ে যায়। ফলে তারা ত্বালূতের ব্যাপারে একমত হয়ে তার নেতৃত্বে জিহাদে রওনা দেয়।[5] মূলতঃ সাকীনাহ নাযিলের কারণে তাদের সকল মতভেদ দূর হয়ে যায়, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে তাদের হৃদয় ভয়শূণ্য হয় এবং জালূতের বিশালদেহী সৈনিকদের সাথে তারা বিপুল সাহস নিয়ে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে। অবশেষে ত্বালূতের নেতৃত্বে মুমিনদের বিজয় সুনিশ্চিত হয়।

২. আচরণ ও কথার মাধ্যমে প্রকাশিত সাকীনাহ :

কখনো কখনো ব্যক্তির আচরণ ও কথার মাধ্যমে সাকীনাহ প্রকাশিত হয় এবং অন্যের হৃদয়কে প্রভাবিত ও প্রশান্ত করে। যুগে যুগে আল্লাহর অনেক মুমিন বান্দা ছিল এবং বর্তমানেও আছে, যাদের কোমল ব্যবহার, প্রজ্ঞাপূর্ণ কথামালা ও বক্তব্য মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটে এবং তাকে আল্লাহমুখী করে। পরহেযগার ব্যক্তির মুখনিঃসৃত প্রভাব বিস্তারকারী এই কথামালাও এক ধরনের সাকীনাহ। যেমন রাসূল (ছাঃ)-এর সদাচরণে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাঁর প্রশান্তিমাখা সান্ত্বনার বাণী শুনে ইয়াসির পরিবার কঠিন নির্যাতন সহ্য করার শক্তি পেয়েছিল। এ ব্যাপারে ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, هِيَ الَّتِي تَنْطِقُ عَلَى لِسَانِ الْمُحَدّثِينَ،… هِيَ مَوْهِبَةٌ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى لَيْسَتْ بِسَبَبِيَّةٍ وَلَا كَسَبِيَّةٍ. وَلَيْسَتْ كَالسَّكِينَةِ الَّتِي كَانَتْ فِي التَّابُوتِ تُنْقَلُ مَعَهُمْ كَيْفَ شَاءُوا، ‘এটা সেই সাকীনাহ, যা বক্তাদের কথার মাধ্যমে উচ্চারিত হয়। এটা আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভা, (ব্যক্তির) কোন অর্জিত বিষয় নয়। আর এটা (বনু ইসরাঈলদের জন্য নাযিলকৃত) সিন্দুকে রক্ষিত সাকীনাহও নয় যে, যেখানে ইচ্ছা সেখানে এটা স্থানান্তর করা যাবে’।[6] মূলতঃ যার হৃদয়ে সাকীনাহ নাযিল হয়, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং শরীরের ভিতর ও বাহির প্রশান্ত হয়। ফলে তার ব্যবহার ও কথা থেকে প্রশান্তির সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ বলেন, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا، ‘রহমান (দয়াময়)-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে’ (ফুরক্বান ২৫/৬৩)।

হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, بِسَكِينَةٍ وَوَقَارٍ مِنْ غَيْرِ جَبَرية وَلَا اسْتِكْبَارٍ، ‘কোন জবরদস্তি ও অহংকার ছাড়াই প্রশান্তি ও সহনশীলতার সাথে (তারা চলাফেরা করে)’।[7] আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন কোন ছাহাবীকে কোন কাজে পাঠাতেন তখন তাকে এ কথা বলতেন যে,يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَسَكِّنُوا وَلَا تُنَفِّرُوا، ‘তোমরা (আচরণ) সহজ করবে, কঠোর হবে না। (মানুষকে) প্রশান্তি দিবে, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াবে না’।[8]

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ اللهَ جَعَلَ الْحَقَّ عَلَى لِسَانِ عُمَرَ وَقَلْبِهِ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ওমরের মুখে ও হৃদয়ে সত্যকে স্থাপন করেছেন’।[9] এই হাদীছের ব্যাখ্যায় আলী, ইবনু আববাস ও ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা এসেছে যে, أَنَّ السَّكِينَةَ تَنْطِقُ عَلَى لِسَانِ عُمَرَ، ‘নিশ্চয়ই ওমরের কথায় সাকীনাহ উচ্চারিত হয়’।[10] অপর বর্ণনায় রয়েছে, أَنَّ السَّكِينَةَ تَنْزِلُ عَلَى لِسَانِ عُمَرَ، ‘ওমরের কথায় সাকীনাহ নাযিল হয়’।[11]

৩. হৃদয়ে অবতীর্ণ সাকীনাহ :

কোন সংকট ও নাজুক পরিস্থিতিতে মুমিন বান্দা যখন অস্থির ও বিচলিত হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তার হৃদয়ে সাকীনাহ নাযিল করে তাকে প্রশান্ত, চিন্তামুক্ত ও নির্ভার করেন। ফলে সে শত জ্বালা-যন্ত্রণা ও বিপদাপদে আল্লাহর উপর ভরসা করে প্রশান্তি অনুভব করে। তবে এই সাকীনাহ বা প্রশান্তি তখনই নাযিল হয়, যখন বান্দার বক্ষদেশ ঈমান ও ইয়াক্বীনের বলে বলীয়ান থাকে। যেমন হিজরতের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন আবুবকর (রাঃ)-কে নিয়ে ছাওর গুহায় আশ্রয় নেন, তখন আল্লাহ তাঁর উপর সাকীনাহ নাযিল করেন। ফলে গুহার উপরে তার প্রাণঘাতি শত্রুদের দেখার পরেও তিনি সমান্যতম বিচলিত ও চিন্তিত হননি। উপরন্তু তিনি আবুবকর (রাঃ)-কে প্রশান্ত থাকার উপদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَمْ تَرَوْهَا، ‘যদি তোমরা তাকে (রাসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখ আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন তাকে কাফেররা (মক্কা থেকে) বের করে দিয়েছিল এবং (ছাওর) গিরিগুহার মধ্যে সে ছিল দু’জনের একজন। যখন সে তার সাথীকে বলল, চিন্তিত হয়ো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার উপর স্বীয় প্রশান্তি নাযিল করলেন ও তাকে এমন সেনাদল দিয়ে সাহায্য করলেন, যাদেরকে তোমরা দেখনি’ (তওবা ৯/৪০)।

আব্দুর রহমান বিন নাছের আস-সা‘দী (রহঃ) বলেন, এখানে সাকীনাহর মর্যাদা ফুটে উঠেছে। কেননা উৎকণ্ঠা ও বিপর্যয়ের সময় বান্দার অন্তর যখন অস্থির হয়ে যায়, তখন সাকীনাহর মাধ্যমে আল্লাহর নে‘মত তাদের উপর পূর্ণতা লাভ করে। ঈমান ও সাহসিকতার মাত্রা অনুযায়ী এই সাকীনাহর পরিমাণ নির্ধারিত হয়’।[12] অনুরূপভাবে বায়‘আতে রিযওয়ান ও হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আল্লাহ তাঁর নবী ও মুমিনদের হৃদয়ে সাকীনাহ নাযিল করে তাদের ঈমানকে মযবূত করেন। আল্লাহ বলেন,لَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন মুমিনদের প্রতি, যখন তারা বৃক্ষের নিচে তোমার নিকট রায়‘আত করেছে। এর মাধ্যমে তিনি তাদের অন্তরে যা ছিল তা জেনে নিলেন। ফলে তিনি তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়’ (ফাৎহ ৪৮/১৮)। ঠিক একইভাবে হুনায়নের যুদ্ধের সংকটকালে যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাহাবী ব্যতীত কেউ ছিল না, তখন আল্লাহ তাদের উপর সাকীনাহ নাযিল করে তাদের হৃদয় প্রশান্ত করে দেন। ফলে তাদের জিহাদী জাযবা, সাহসিকতা ও তেজস্বিতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

সাকীনাহর গুরুত্ব ও তাৎপর্য:

সাকীনাহ আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ রহমত ও নে‘মত। মুমিনের জীবনে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ছয় জায়গায় বিভিন্ন সংকটকালীন মুহূর্তে তাঁর নবী ও মুমিন বান্দাদের উপর সাকীনাহ নাযিল করার কথা বলেছেন।[13] নিমেণ সাকীনাহর গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরা হ’ল।

১. ওহী নাযিলের সময় সাকীনাহ :

যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর ওহী নাযিল হ’ত তখন তার উপর সাকীনাহ নাযিল হ’ত, যেন তিনি প্রশান্তির সাথে সেটা গ্রহণ করতে পারেন। যায়েদ ইবনে ছাবিত (রাঃ) বলেন,

كُنْتُ إِلَى جَنْبِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَغَشِيَتْهُ السَّكِينَةُ، فَوَقَعَتْ فَخِذُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى فَخِذِي، فَمَا وَجَدْتُ ثِقْلَ شَيْءٍ أَثْقَلَ مِنْ فَخِذِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ،

‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পাশে ছিলাম। এমতাবস্থায় সাকীনাহ বা প্রশান্তি তাঁকে আচ্ছন্ন করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ঊরু আমার ঊরুর উপর পড়ল। আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ঊরুর চেয়ে অধিক ভারী কোন জিনিসি অনুভব করিনি’।[14] ড. আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়ার মুহূর্তটি খুব কষ্টকর ছিল তাই আল্লাহ ওহী নাযিলের সময় তাঁর উপর সাকীনাহ বা প্রশান্তি নাযিল করতেন।[15]

২. সাকীনাহ আল্লাহর একটি বিশেষ নে‘মত :

বান্দার জীবনে আল্লাহর বড় একটি নে‘মত হ’ল সাকীনাহ। বান্দার হৃদয় যখন বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অশান্ত হওয়ার উপক্রম হয়, তখন আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাকে এই নে‘মতের মাধ্যমে সম্মানিত করেন। যেমন তিনি বলেন,فَأَنْزَلَ اللهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ- ‘অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মুমিনদের উপর তাঁর সাকীনাহ (প্রশান্তি) নাযিল করলেন’ (ফাৎহ ৪৮/২৬)। আব্দুর রহমান আস-সা‘দী (রহঃ) বলেন,السكينة ما يجعله الله في القلوب وقت القلاقل والزلازل والمفظعات، مما يثبتها، ويسكنها ويجعلها مطمئنة، وهي من نعم الله العظيمة على العباد، ‘সংকটকালীন মুহূর্তে, দুর্যোগ ও অস্থিরতায় আল্লাহ (মুমিনদের) হৃদয় সমূহে প্রাশান্তি নাযিল করেন, যা তাদের হৃদয়গুলোকে শক্তিশালী, আশ্বস্থ ও প্রশান্ত করে। সুতরাং এটা (সাকীনাহ) বান্দার প্রতি আল্লাহর অন্যতম একটি বড় নে‘মত’।[16] কারণ আল্লাহমুখী হওয়ার অন্যতম বড় উপাদান হ’ল সাকীনাহ। হৃদয়ে সাকীনাহ অনুভূত হ’লে আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতার শক্তি বাড়ে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর আনুগত্যে নুয়ে পড়ে। ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, السكينة إذا نزلت على القلب اطمأن بها وسكنت إليها الجوارح وخشعت واكتسبت الوقار، وأنطقت اللسان بالصواب والحكمة، وحالت بينه وبين كل باطل، ‘অন্তরে যখন সাকীনাহ নাযিল হয়, তখন মনে প্রশান্তি অনুভূত হয়। ফলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও প্রশান্তি, নমনীয়তা ও সুস্থিরতা বিরাজ করে। মুখ দিয়ে সত্য ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বের হয় এবং ব্যক্তি ও অন্যায়ের মাঝে প্রভেদ রচিত হয়’।[17] অর্থাৎ সাকীনাহ আল্লাহর এমন বড় নে‘মত ও রহমত, যার মাধ্যমে দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতে শান্তির ঠিকানা সুনিশ্চিত হয়।

৩. সাকীনাহর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর নেককার বান্দাকে সাহায্য করেন :

মহান আল্লাহ তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূল এবং নেককার বান্দাদের যে সকল মাধ্যম দিয়ে সহযোগিতা করেন, তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল সাকীনাহ বা প্রশান্তিময় পবিত্র অনুভূতি। যখন নমরূদ বাহিনী ইবরাহীম (আঃ)-কে আগুনে নিক্ষেপ করে, তখন আল্লাহ সাকীনাহ নাযিল করেছিলেন। ফলে সেই কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি কারো সাহায্যের মুখাপেক্ষী হননি। এমনকি আল্লাহর নির্দেশে জ্বলন্ত আগুনও তাঁর জন্য প্রশান্তিদায়ক হয়ে যায়। অনুরূপভাবে নবী ইসমাঈল (আঃ)-এর উপরেও সাকীনাহ নাযিল হয়েছিল। ফলে অল্প বয়সে আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজেকে কুরবানী করতে কুণ্ঠিত হননি। মূসা (আঃ)-এর ঘটনাবহুল জীবনের পরতে পরতে আল্লাহ সাকীনাহ নাযিল করেছিলেন। আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আল্লাহ সাকীনাহ অবতীর্ণ করেছেন। ওহোদ যুদ্ধের বিপর্যয়ে মহান আল্লাহর প্রশান্তির তন্দ্রা দিয়ে মুসলিম বাহিনীকে সহযোগিতা করেন। যার ফলশ্রুতিতে তাদের সকল ক্লান্তি, অবসাদ, সংশয় ও ভয় দূরীভূত হয়। আল্লাহ বলেন, ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ بَعْدِ الْغَمِّ أَمَنَةً نُعَاسًا يَغْشَى طَائِفَةً مِنْكُمْ، ‘অতঃপর আল্লাহ তোমাদের উপর দুঃখের পরে তন্দ্রার শান্তি নাযিল করলেন, যা তোমাদের একদলকে (দৃঢ়চেতাগণকে) আচ্ছন্ন করেছিল’ (আলে ইমরান ৩/১৫৪)। মুসলিম বাহিনীর জন্য এই তন্দ্রাচ্ছন্নতা ছিল এক ধরনের সাকীনাহ ও রহমত।[18]

অনুরূপভাবে হুনায়ানের যুদ্ধে ভোর রাতে গিরিসংকটে সংকীর্ণ পথে মুসলিম বাহিনী তীর বৃষ্টিতে আক্রান্ত হন, ফলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং রাসূলের সাথে থাকা মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া সবাই দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। অতঃপর আল্লাহ তাঁর নবী ও মুমিনদের উপর সাকীনাহ নাযিল করেন। ফলে ছাহাবীগণ সবাই রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে ছুটে আসেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। অবশেষে আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় দান করেন। আল্লাহর ভাষায়, ثُمَّ أَنْزَلَ اللهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ- ‘অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূল ও বিশ্বাসীগণের প্রতি তাঁর বিশেষ প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং এমন সেনাবাহিনী নাযিল করলেন, যাদেরকে তোমরা দেখনি। আর অবিশ্বাসীদের শাস্তি দিলেন। আর এটাই হ’ল অবিশ্বাসীদের কর্মফল’ (তওবা ৯/২৬)। আল্লামা শাওক্বানী (রহঃ) বলেন, এই সাকীনাহ অবতীর্ণ হওয়ার কারণে তাদের জিহাদী জাযবা বেড়ে যায়, তাদের পদযুগল সুদৃঢ় হয়, সকল ভয়-ভীতি কেটে যায় এবং তারা একেবারে আশংকামুক্ত হয়ে যান।[19]

সুতরাং যুগে যুগে যারাই আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেকে সঁপে দিতে পারবেন, তারাই গায়েবীভাবে সাকীনাহর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে মদদপুষ্ট হবেন। যেই গায়েবী প্রশান্তির কারণে আছহাবুল উখদূদ জ্বলন্ত অগ্নিকান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশান্ত ছিল, ফেরাউনের নির্যাতনে পিষ্ট হয়ে আসিয়া প্রশান্ত ছিলেন। অনুরূপভাবে ইয়াসির পরিবার, বেলাল, খুবায়েব, খাববাব, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, ইবনু তায়মিয়া, ইমাম আহমাদ সহ হকপন্থী বান্দাগণ যুলুম-নির্যাতনের কষাঘাত সহ্য করতে পেরেছিলেন কেবল সেই সাকীনাহর কারণে।

৪. সকল ইবাদতে সাকীনাহ অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে :

আল্লাহর ইবাদতের স্বাদ আস্বাদন এবং পরিতৃপ্তি লাভের প্রধান মাধ্যম হ’ল সাকীনাহ। কেননা ইবাদতে প্রশান্তির অনুভূতি জাগ্রত না হ’লে কোন ইবাদত করে তৃপ্তি পাওয়া যায় না। হয়তো ইবাদতটা সম্পাদিত হয়ে যায়, কিন্তু পরিতৃপ্তি সেখানে অনুপস্থিত থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা ছালাত আদায় করি, কুরআন তেলাওয়াত করি, তাহাজ্জুদ পড়ি, মৃত্যুর কথা মনে করি, কিন্তু সেটা আমাদের হৃদয়ে তেমন দাগ কাটে না। আবার এমন সময়েও আমরা উপনীত হই, যখন ছালাত আদায় করে আমরা আলাদা একটি প্রশান্তি লাভ করি, কুরআনের মর্মবাণী ও সুরধ্বনি হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে, মৃত্যুর কথা গভীরভাবে স্মরণ হয়, তখন দুনিয়ার স্বাদ তিক্ত হয়ে যায়। মন-প্রাণ আখেরাতের পানে ছুটে চলে। সময়ের ঘূর্ণাবতে আমাদের ইবাদতের অবস্থার এই তারতম্যের একটি কারণ হ’ল ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি।

আরেকটি কারণ হ’ল ইবাদতের ভাবগাম্ভীর্য, ধীরতা ও সাকীনাহ বজায় না রাখা। কারণ আমরা অধিকাংশ সময় অভ্যাসে তাড়িত হয়ে ইবাদতে রত হই। আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর রেযামন্দী হাছিলের নিয়তে খুব কম সময়ই ইবাদতে রত হ’তে পারি। সেকারণ রাসূল (ছাঃ) সকল ইবাদতে সাকীনাহ অবলম্বণের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন ছালাতের জামা‘আতে শরীক হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন,إِذَا أُقِيمَت الصَّلَاة فَلَا تأتوها تَسْعَوْنَ وَأْتُوهَا تَمْشُونَ وَعَلَيْكُمُ السَّكِينَةُ فَمَا أَدْرَكْتُمْ فَصَلُّوا وَمَا فاتكم فَأتمُّوا، ‘যখন ছালাত শুরু হয়, তখন তোমরা দৌড়ে গিয়ে ছালাতে যোগদান করবে না; বরং হেঁটে গিয়ে ছালাতে যোগদান করবে। তোমাদের জন্য (ছালাতে) ধীর-স্থিরতা (সাকীনাহ) অবলম্বন করা অবশ্যক। সুতরাং ইমামের সাথে যতটুকু পাবে আদায় করবে, আর যতটুকু ছুটে যাবে ততটুকু পূর্ণ করবে’।[20]

হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! এখানে দৌড়ে ছালাতে যোগদানের কথা বলা হয়নি; বরং ধীর-স্থিরতা অবলম্বন না করে তাড়াহুড়া করতে নিষেধ করা হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক গাম্ভীর্য নিয়ে ইবাদত সম্পাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।[21] একইভাবে ছিয়াম ও হজ্জের ব্যাপারেও ধীর-স্থিরতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন সেই ইবাদতের ভাব-গাম্ভীর্য অক্ষুণ্ণ থাকে। এর মাধ্যমে সাকীনাহ নাযিল হয় এবং হৃদয়জুড়ে তৃপ্তি অনুভূত হয়।[22] অনুরূপভাবে নারীদেরকে পর্দার বিধান মানার ব্যাপারে সাকীনাহ অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى، ‘আর তোমরা নিজ নিজ গৃহে অবস্থান কর। পূর্বতন জাহেলী যুগের নারীদের ন্যায় সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না’ (আহযাব ৩৩/৩৩)। ইমাম ত্বাবারী (রহঃ) বলেন, এই আয়াতের অর্থ হ’ল,كن أهل وقار وسكينة في بيوتكن، ‘তোমরা স্ব স্ব গৃহে শালীনতা ও (পর্দার) গাম্ভীর্যতা বজায় রাখ’।[23]

৫. রাসূল ও ছাবাবীগণ সাকীনাহ লাভের জন্য দো‘আ করতেন :

জীবনের সকল দিক ও বিভাগে প্রশান্তি লাভের জন্য সাকীনাহর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এবং তাঁর ছাহাবীগণ সাকীনাহ লাভের জন্য দো‘আ করতেন। বারা ইবনে আযেব (রাঃ) বলেন, খন্দকের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাটি বহন করছিলেন এবং আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ)-এর কবিতা আবৃত্তি করছিলেন,

اللَّهُمَّ لَوْلاَ أَنْتَ مَا اهْتَدَيْنَا ­­+ وَلاَ تَصَدَّقْنَا وَلاَ صَلَّيْنَا،

فَأَنْزِلَنْ سَكِينَةً عَلَيْنَا + وَثَبِّتِ الأَقْدَامَ إِنْ لاَقَيْنَا،

‘হে আল্লাহ! আপনি যদি আমাদের হেদায়াত না দিতেন, তাহ’লে আমরা হেদায়াত পেতাম না। আমরা ছাদাক্বাহ করতাম না। ছালাতও আদায় করতাম না। সুতরাং আপনি আমাদের প্রতি প্রশান্তি অবতীর্ণ করুন এবং দুশমনের সম্মুখীন হওয়ার সময় আমাদের দৃঢ়পদ রাখুন’।[24]

সাকীনাহর প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা

মুমিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাকীনাহর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তাছাড়া সাকীনাহ প্রাপ্তিতে রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা। যেমন-

১. সাকীনাহ ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি করে :

আল্লাহর অনুগত্যে ঈমান বাড়ে এবং পাপের মাধ্যমে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। আবার কখনো কখনো সাকীনাহ নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার ঈমানী শক্তি বাড়িয়ে দেন। যেমন- হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আল্লাহ তাঁর নবী ও মুমিনদের অন্তরে সাকীনাহ নাযিল করেন। ফলে তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং সন্ধির শর্তাবলী নিজেদের বিরুদ্ধে থাকা সত্ত্বেও তারা তা মেনে নেন। অতঃপর এই সন্ধির মাধ্যমেই মক্কা বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত হয়। আল্লাহ বলেন, هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَعَ إِيمَانِهِمْ- ‘তিনিই মুমিনদের অন্তর সমূহে প্রশান্তি নাযিল করেন, যেন তারা তাদের ঈমানের সাথে আরো ঈমান বৃদ্ধি করে নেয়’ (ফাৎহ ৪৮/৮)। আল্লামা শাওক্বানী (রহঃ) এই আয়াতে বর্ণিত সাকীনাহর তাফসীরে বলেন,ليزدادوا بسبب تلك السكينة إيمانا منضما إلى إيمانهم الحاصل لهم من قبل، ‘যেন তারা সেই সাকীনাহ্ বা প্রশান্তিময় অনুভূতির মাধ্যমে তাদের পূর্বেকার লালিত ঈমানের সাথে আরো ঈমান বাড়াতে পারে’।[25] আবূ ত্বালেব মাক্কী (রহঃ) বলেন,أعز ما نزل من السماء وهو السكينة المنزلة في قلوب المؤمنين لمزيد الإيمان، ‘আকাশ থেকে অবতীর্ণ সবচেয়ে মর্যাদাবান বিষয় হ’ল সাকীনাহ, যা ঈমান বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য মুমিনদের হৃদয়ে নাযিল হয়’।[26]

২. আল্লাহর অনুগত্যে অবিচল থাকা যায় :

দ্বীনের পথে অবিচল থাকার জন্য সাকীনাহর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কারণ এর মাধ্যমে ধৈর্য শক্তি ও মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়। ওহোদ যুদ্ধে, বায়‘আতে রিযওয়ানে এবং হুনায়নের যুদ্ধে আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসাবে যখন সাকীনাহ নাযিল হয়, তখন মুমিনদের যে ঈমানী দৃঢ়তা ও হিমাদ্রীসম অবিচলতা প্রকাশ পেয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় ভাস্বর হয়ে আছে। দ্বীনের পথে এই ইস্তিক্বামাতের জন্য প্রতি পদে সাকীনাহর প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে ইমাম শাওক্বানী (রহঃ) বলেন,معنى الاستقامة: ترك الاستعجال ولزوم السكينة والرضا والتسليم لما يقضي به الله سبحانه، ‘ইস্তিক্বামাতের অর্থ হ’ল তাড়াহুড়া পরিহার করা, মানসিক দৃঢ়তাকে অপরিহার্য করে নেওয়া এবং আল্লাহর নির্ধারিত ফায়ছালার কাছে আত্মসমর্পণ করা ও তাতে খুশি থাকা’।[27] ইমাম ত্বাবারী (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তাঁর নবী-রাসূল ও মুমিন বান্দাদের উপরে যে সাকীনাহ নাযিল করেছেন, সেটা ছিল ধৈর্যশক্তি ও মানসিক দৃঢ়তার জন্য সহায়ক’।[28]

৩. অন্তরজগৎ প্রশস্ত ও আলোকিত হয় :

সাকীনাহ মুমিন বান্দার হৃদয়জগৎ আলোকিত করে। ফলে তার বক্ষদেশ আল্লাহর বিধি-বিধান পালনে সুপ্রশস্ত হয়। তখন শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয় এবং জীবন হয়ে ওঠে আল্লাহমুখী। আর হৃদয় আলোকিত হওয়ার মূল কারণ হ’ল তার ঈমানের প্রবৃদ্ধি। ঈমান যত বাড়ে, হৃদয় তত আলোকিত হয়। সাকীনাহ অবতীর্ণ হয়ে বান্দার ঈমানকে জাগিয়ে তোলে এবং অহি-র আলোয় উদ্ভাসিত করে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই মুমিনদের অন্তর সমূহে প্রশান্তি নাযিল করেন, যেন তারা তাদের ঈমানের সাথে আরো ঈমান বৃদ্ধি করে নেয়’ (ফাৎহ ৪৮/৪)।

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাস্সির আল-ক্বাশানী (রহঃ) বলেন,السكينة نور في القلب يسكن به إلى شاهده ويطمئن. وهو من مبادئ عين اليقين، بعد علم اليقين، كأنه وجدان يقينيّ معه لذة وسرور، ‘সাকীনাহ হ’ল হৃদয়ের আলো। আলো লাভকারী এর মাধ্যমে স্বস্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে। নিশ্চিত বিশ্বাসের পরে এটা চাক্ষুষ বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। যেন এটা শান্তি ও সুখ মিশ্রিত সুনিশ্চিত অনুভূতি’।[29] শায়খ উছায়মীন (রহঃ) বলেন, السكينة إذا نزلت في القلب اطمأن الإنسان، وارتاح، وانشرح صدره لأوامر الشريعة، وقَبِلها قبولاً تاماً، ‘অন্তরে যখন সাকীনাহ নাযিল হয়, তখন মানুষ প্রশান্তি পায় এবং আত্মিকভাবে আরাম বোধ করে। শরী‘আতের বিধি-বিধান পালনে তার বক্ষ প্রশস্ত হয় এবং পরিপূর্ণভাবে তা গ্রহণ করে নেয়’।[30]

৪. চিন্তামুক্ত সুখী জীবনের হাতিয়ার :

মানসিক চাপ জীবনের একটি ধ্রুব বাস্তবতা। মানবজীবনে বিচিত্র ধরনের উত্থান-পতন রয়েছে, রয়েছে অসংলগ্নতা, দুঃখ-কষ্ট, অপ্রাপ্তি, অশান্তি, টেনশন ও বেদনার নিদারুণ কষাঘাত। সমস্যাসংকুল পৃথিবীতে মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে সীমাহীন অস্থিরতা ও দুঃচিন্তায়। ফলে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই কম-বেশী মানসিক অশান্তিতে ভোগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে কেউ না কেউ আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রাণ হারায়। এসব আত্মহত্যাকারীরা কোন না কোনভাবে মানসিক অশান্তিতে আক্রান্ত থাকে। এ থেকে বুঝা যায়, মানসিক সুস্বাস্থ্য ও প্রশান্তি মানুষের কতবেশী যরূরী। কিন্তু এ মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার উপায় কী? উপায় একটাই, তা হ’ল আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সাকীনাহ। সাকীনাহর প্রশান্তিময় পবিত্র অনুভূতি দিয়ে আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন, কেবল সে-ই যাবতীয় অশান্তি, দুশ্চিন্তা ও টেনশন থেকে মুক্তি পেতে পারে। তবে জীবনজুড়ে সেই সাকীনাহ্ পেতে হ’লে বান্দাকে কতিপয় উপায় অবলম্বন করতে হবে। সামনে সাকীনাহ লাভের নানাবিধ উপায় ও মাধ্যম নিয়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

৫. প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে :

যারা ইবাদত-বন্দেগী ও কুরআন-হাদীছে বর্ণিত বিভিন্ন উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহর কাছ থেকে সাকীনাহ লাভ করতে পারে, তারা সৌভাগ্যের সোপান পেরিয়ে দুনিয়াতে সুখী হয় এবং আখেরাতেও চিরসুখের জান্নাতে আশ্রয় লাভ করে। এমনকি তার জান কবযের সময় মৃত্যুর ফেরেশতারা তাকে প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী বলে সম্বোধন করে। আল্লাহর ভাষায়,يَاأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ، ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً، فَادْخُلِي فِي عِبَادِي، وَادْخُلِي جَنَّتِي- ‘হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে চল তোমার প্রভুর পানে, সন্তুষ্ট চিত্তে ও সন্তোষভাজন অবস্থায়। অতঃপর প্রবেশ কর আমার বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ কর আমার জান্নাতে’ (ফজর ৮৯/২৭-৩০)।

হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন,إِذَا أَرَادَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ قَبْضَهَا اطْمَأَنَّتْ إِلَى اللهِ وَاطْمَأَنَّ اللهُ إِلَيْهَا، وَرَضِيَتْ عَنِ اللهِ وَرَضِيَ اللهُ عَنْهَا، فَأَمَرَ بِقَبْضِ رُوحِهَا، وَأَدْخَلَهَا اللهُ الجَنَّةَ، وَجَعَلَهُ مِنْ عِبَادِهِ الصَّالِحِينَ، ‘আল্লাহ যখন কোন প্রশান্ত আত্মা কবয করার ইচ্ছা করেন, তখন সেই আত্মা আল্লাহর প্রতি আস্থাশীল থাকে এবং আল্লাহও তার প্রতি খুশি থাকেন। সে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। অতঃপর আল্লাহ সেই রূহ কবয করার নির্দেশ দেন। এরপর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান এবং তার নেককার বান্দাদের মাঝে শামিল করেন’।[31]

সুতরাং আল্লাহর দুনিয়ায় প্রশান্ত চিত্তে বসবাসের জন্য এবং আখেরাতের জীবনে জান্নাতের বাসিন্দা হওয়ার জন্য সাকীনাহর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনজুড়ে সাকীনাহ নাযিল করুন এবং প্রশান্ত চিত্তে সন্তোষভাজন হয়ে তাঁর দিকে ফিরে যাওয়ার তাওফীক্ব দান করুন। (ক্রমশঃ)

আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ

এম.এ, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালেকীন, ২/৪৭১।

[2]. জুরজানী, আত-তা‘রীফাত, পৃ. ১২০।

[3]. ইবনুল ক্বাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াক্কি‘ঈন, ৪/১৫৫।

[4]. উক্ত নবীর নাম শামভীল (شَمْوِيلُ) বা শ্যামুয়েল। কুরতুবী বলেন, এটাই অধিক প্রকাশ্য (কুরতুবী; বিস্তারিত দ্র. ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব প্রণীত ‘নবীদের কাহিনী’ হযরত দাঊদ (আঃ) অধ্যায় ২/১১৯-১২৫ পৃ.)।

[5]. তাফসীরে কুরতুবী, ৩/২৪৮-২৪৯।

[6]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালেকীন, ২/৪৭৪।

[7]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৬/১২১।

[8]. মুসলিম হা/১৭৩২; মিশকাত হা/৩৭২৩।

[9]. তিরমিযী হা/৩৬৮২; ইবনু মাজাহ হা/১০৮; ছহীহুল জামে‘ হা/১৭৩৬; মিশকাত হা/৬০৪২, সনদ হাসান।

[10]. আহমাদ হা/৮৩৪; তাবারাণী, মু‘জামুল আওসাত্ব হা/৫৫৪৯; হায়ছামী, মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/১৪৪২৭, সনদ হাসান।

[11]. ত্বাবারাণী, মু‘জামুল কাবীর হা/৮২০২; শাওকানী, দুর্রুস সাহাবাহ হা/১০২; মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/ ১৪৪২৯, সনদ হাসান।

[12]. তাফসীরে সা’দী, পৃ. ৩৩৮।

[13]. বাক্বারাহ ২/২৪৮; তাওবাহ ৯/২৬,৪০; ফাৎহ ৪৮/৪,১৮,২৬।

[14]. আবূদাঊদ হা/২৫০৭; মুস্তাদরাকে হাকেম হা/২৪২৮, সনদ ছহীহ।

[15]. ড. আব্দুল মুহসিন আল-আববাদ, শরহ আবুদাঊদ, ১৩/৩৯৯।

[16]. তাইসীরুল কারীমির রহমান (তাফসীরে সা‘দী), পৃ. ৩৩২।

[17]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালেকীন, ২/৪৭৩।

[18]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ২/১৪৪।

[19]. শাওক্বানী, ফাৎহুল ক্বাদীর, ২/২৪৩।

[20]. বুখারী হা/৯০৮; মুসলিম হা/৬০২; মিশকাত হা/৬৮৬।

[21]. কুরতুবী, ১৮/১০৩।

[22]. বুখারী হা/১৬৭১; ৩৩০১; মুসলিম হা/১২৮২; তিরমিযী হা/৮৮৬; নাসাঈ হা/৩০১৯।

[23]. তাফসীর ত্বাবারী, ২০/২৫৯।

[24]. বুখারী হা/৪১০৬; মুসলিম হা/১৮০৩; মিশকাত হা/৪৭৯২।

[25]. শাওক্বানী, ফাৎহুল ক্বাদীর, ৫/৫৪।

[26]. আবূ ত্বালেব মাক্কী, কূতুল কুলূব ফী মু‘আমালাতিল মাহবূব, ২/১৪৭।

[27]. ফাৎহুল ক্বাদীর, ২/৫৩৩।

[28]. তাফসীর ত্বাবারী, ২২/২২৮।

[29]. মুহাম্মাদ জামালুদ্দীন ক্বাসেমী, মাহাসিনুত তা’বীল, ৮/৪৮৫।

[30]. উছায়মীন, তাফসীর সূরা ফাতিহা ও বাক্বারাহ, ৩/২১৯।

[31]. বুখারী ৬/১৬৯।

সংগ্রহ তথ্য: মাসিক আত-তাহরীক, জুন ২০২২ ইং

এই পোষ্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই বিভাগের আরও পোস্ট...

আজকের দিন-তারিখ

  • বুধবার (সন্ধ্যা ৭:১১)
  • ৬ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • ৭ই জিলহজ, ১৪৪৩ হিজরি
  • ২২শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)

© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত avasmultimedia.com ২০১৯-২০২২ ‍

ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD