মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ০৫:৩৫ অপরাহ্ন

চোখের হেফাযত -ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
Kaji Asad / ২২৪ কত বার
আপডেট: বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১
চোখের হেফাযত
ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
আধুনিক যুগে ফেৎনার যে জোয়ার প্রবাহিত হচ্ছে তার মধ্যে মুসলিম যুবকদের জন্য সবচেয়ে বড় ফেৎনা হ’ল সাংস্কৃতিক ফেৎনা। হাযারো মিডিয়ায় বিনোদন ও সংস্কৃতির নামে যৌনতা ও নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ককে অশ্লীল ও তথাকথিত শিল্পিত রূপ দিয়ে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক অধঃপতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর সাথে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর উঠেছে। ফেসবুক বা ইউটিউবের মত আপাত নিরীহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করলেও যেকোন মুহূর্তে অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার ভুরি ভুরি হাতছানি তরুণদেরকে সহজেই বিভ্রান্ত করে দেয়। কোন অনৈতিক পরামর্শ তাকে অতি সহজেই প্রতারিত করে ফেলে। আর নিয়মিত এই প্রতারণার শিকার হ’তে থাকলে নৈতিকতার দৃঢ় বাঁধনগুলো একসময় আলগা হ’তে থাকে। কলুষতা আর পঙ্কিলতায় মিইয়ে যেতে থাকে অন্তরের পবিত্র আভা। অবশেষে একসময় সে হারিয়ে যায় অধঃপতনের করাল গ্রাসে।
প্রিয় পাঠক, চোখ হ’ল মানুষকে দেয়া আল্লাহ এক গুরুত্বপূর্ণ নে‘মত। এক মহাসম্পদ। পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেট থেকে এমন অবস্থায় বের করেছেন যখন তোমরা কিছুই জানতে না এবং তোমাদেরকে কান, চোখ ও হৃদয়সমূহ দিয়েছে যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’ (নাহল ৭৮)। তাই এই নে‘মতের অপব্যবহার করলে একদিন আল্লাহর কাছে কঠোর জবাবদিহিতার সম্মুখীন হ’তে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয়- প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে’ (বনু ইস্রাঈল ১৭/৩৬)। সুতরাং চোখের হেফাযত করা বিশেষত বর্তমান যুগের তরুণ সমাজের জন্য অতীব যরূরী। কেননা হাল যামানায় সংঘটিত প্রায় সকল সামাজিক পাপের জন্য মূলত চোখই দায়ী। চোখের পাপ থেকে বাঁচা এবং চোখের হেফাযতের জন্য আমরা নিম্নোক্ত কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি-
(১) দৃষ্টি সংযত রাখা : দৃষ্টি হ’ল শয়তানের বিষাক্ত তীরের মত, যা দিয়ে শয়তান খুব সহজেই মানুষকে পাপের ফাঁদে আটকাতে পারে। এজন্য আল্লাহ বলেন, (হে মুহাম্মাদ!) বিশ্বাসীদের বল, তারা যেন দৃষ্টিকে সংযত করে এবং যৌনাঙ্গকে হেফাযত করে। এটাই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত (আন-নূর ৩০)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, চোখের যেনা হল দৃষ্টিপাত করা, জিহবার যেনা হল কথা বলা এবং অন্তরের যেনা হল কুপ্রবৃত্তি ও কুকামনার বশবর্তী হওয়া। আর যৌনাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে (বুখারী হা/৬২৪৩; মুসলিম হা/২৬৫৭)। সুতরাং রাস্তাঘাটে চলাফেরা, পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ায় পদচারণা, ইন্টারনেটে ব্রাউজ করা সর্বক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রাখার এই নীতি কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে।
(২) একাকী নির্জনে না থাকা : একাকিত্ব ও কর্মহীনতা মানুষকে সহজেই পাপের পথে ধাবিত করে। মানুষের অধিকাংশ পাপ একাকিত্বের সময়ই সংঘটিত হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যদি লোকেরা একাকিত্বের মাঝে কি ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি; তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না’ (বুখারী হা/২৮৯৮)।
বর্তমান ফেৎনার যুগে গোপন পাপ সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-এর একটি ভয়ংকর হুশিয়ারী বার্তা আমাদের মনে রাখা অতীব যরূরী। তিনি বলেন, ‘আমি আমার উম্মতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি, যারা কিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমলসহ উপস্থিত হবে। আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। রাবী ছাওবান (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন, তারা তোমাদেরই ভাই এবং তোমাদেরই সম্প্রদায়ের। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতই ইবাদত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে সুযোগ পেলে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হয় (ইবনু মাজাহ হা/৪২৪৫)। আল্লাহ বলেন, ‘তারা মানুষ থেকে গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহর থেকে গোপন করে না; অথচ তিনি তাদের সংগেই রয়েছেন, যখন তারা রাতে আল্লাহর অপসন্দনীয় কোন কথা নিয়ে পরামর্শ করে। আর তারা যা করে তা সবই আল্লাহর জ্ঞানায়ত্ত’ (নিসা ১০৮)।
(৩) শয়তানের প্রতারণা থেকে সদা সতর্ক থাকা : তরুণ সমাজকে সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, শয়তান আমাদের সবচেয়ে বড় ও প্রকাশ্য শত্রু। তাই নিজেকে কখনোই শয়তানের ফিতনা থেকে নিরাপদ ভাবা যাবে না। সেই সাথে নিজের ভেতরকার প্রচন্ড নৈতিকতাবোধকে সদা জাগ্রত ও সুদৃঢ় রাখতে হবে, যেন কোন অসতর্ক মুহূর্তেও শয়তান কোনভাবে প্রতারিত করতে না পারে। শয়তানের করাঘাত অনুভূত হওয়া মাত্রই শয়তানকে পরাজিত করার তীব্র স্পৃহা যেন সজাগ হয়ে উঠে। শয়তানকে মোটেই প্রশ্রয় না দিয়ে এভাবে নিজের মনকে প্রস্ত্তত করাটা খুবই যরূরী। যদি তা করা সম্ভব হয়, তবে একসময় অবচেতনভাবে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ শক্তি ও বিবেকের বন্ধন প্রবল হয়ে উঠবে। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নিজের মধ্যে প্রতিরোধবর্ম তৈরী হবে।
আর যদি শয়তানকে প্রশ্রয় দেয়া হয় এবং পাপ করাটা একবার সহজ হয়ে যায়, তাহলে প্রবৃত্তির কাছে সে নিয়মিতই পরাজিত হতে থাকবে, যেখান থেকে বের হয়ে আসা তার জন্য হয়ে উঠবে কঠিন থেকে কঠিনতর। হুযায়ফা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, চাটাই বুনন বা ছিলকার মত এক এক করে ফেৎনা মানুষের অন্তরে আসতে থাকবে।
যে অন্তরে তা গেঁথে যাবে তাতে একটি করে কালো দাগ পড়বে। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করবে তাতে একটি উজ্জ্বল দাগ পড়বে। এমনি করে দুই অন্তর দু’ধরণের হয়ে যায়। একটি হয়ে যায় মসৃণ সাদা পাথরের ন্যায়; যে অন্তর আসমান ও যমীন যতদিন থাকবে ততদিন কোন ফেৎনা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর অপরটি হয়ে যায় কলসির উল্টা পিঠের ন্যায় ধুসর কালো, যে অন্তর ভালোকে ভালো বলে জানবে না; আবার খারাপকেও খারাপ মনে করবে না, কেবল প্রবৃত্তির দাসত্ব ছাড়া। অর্থাৎ ভালো-মন্দ পার্থক্যের অনুভূতি হারিয়ে ফেলে প্রবৃত্তির অনুসরণে সে যা ইচ্ছা তাই করবে (মুসলিম হা/১৪৪)।
সুতরাং যদি নিয়মিত বিবেক ও হৃদয়ের এই প্রতিরোধ শক্তি জাগ্রত রাখতে পারি, তবে একসময় তা আল্লাহর রহমতে হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে যাবে। আর এমন হৃদয়ে সহজে কোন পাপ-পঙ্কিলতা প্রবেশ করতে পারবে না। যেমনটি উপরোক্ত হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। অতএব মনকে নিয়ন্ত্রণ করার এই কৌশল আমাদেরকে অবশ্যই আয়ত্ম করতে হবে, যদি আমরা পাপমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর কাছে উপস্থিত হতে চাই। সবশেষে যাবতীয় প্রতিরোধ ও অনিচ্ছাসত্ত্বেও কোনক্রমে পাপ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করতে হবে এবং কোন একটি ভালো কাজ দ্বারা সেটির কাফ্ফারা আদায় করতে হবে। যেন তার প্রভাব কোনভাবেই অন্তরে বিস্তার লাভ করতে না পারে (তিরমিযী হা/১৮৯৭)।
আল্লাহ রাববুল আলামীন আমাদের সকল পাঠক ও পাঠিকা ভাই-বোনকে চক্ষু হেফাযতের মত এই গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক প্রতিরোধ বুহ্যটি ধারণ করা ও আয়ত্ম করার তাওফীক দান করুন এবং ছোট-বড় যাবতীয় পাপকর্ম থেকে নিজেকে হেফাযত করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর..
জনপ্রিয় পোস্ট
সর্বশেষ আপডেট