প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত
||
জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল ও ফজিলত
? ভূমিকা:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ, তাঁর পরিবারবর্গ, সাহাবায়ে কেরাম এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারীদের উপর।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, ইসলামী বর্ষপঞ্জির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস হলো জিলহজ মাস। এই মাসের প্রথম ১০ দিন এমন এক মহামূল্যবান সময়, যাকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এই দিনগুলোতে নেক আমল আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়। সালফে সালেহীনগণ এই দিনগুলোকে ইবাদত, তাওবা, যিকির, তাকবীর ও কুরআন তিলাওয়াতে জীবন্ত করে তুলতেন।
রাসূল ﷺ বলেছেন-
“এমন কোনো দিন নেই, যেদিন নেক আমল আল্লাহর কাছে এই ১০ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়।”
- সহীহ বুখারী, হাদীস: ৯৬৯
? প্রথম পর্ব:
জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত-
১. আল্লাহ তাআলা এই ১০ রাতের শপথ করেছেন:
আল্লাহ বলেন-
وَالْفَجْرِ وَلَيَالٍ عَشْرٍ
অর্থঃ “শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতের।”
-সূরা আল-ফাজর: ১-২
তাফসীরে ইবনে কাসীরসহ বহু মুফাসসির বলেছেন, এখানে “দশ রাত” দ্বারা জিলহজের প্রথম ১০ দিন উদ্দেশ্য।
? শিক্ষণীয় বিষয়:
আল্লাহ যখন কোনো কিছুর কসম করেন, তখন বুঝতে হবে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ।
২. নেক আমলের সবচেয়ে প্রিয় সময়:
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত-
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“জিলহজের প্রথম ১০ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ আমল আর নেই।”
সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহর পথে জিহাদও নয়?” তিনি বললেন- “জিহাদও নয়; তবে সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যে নিজের জীবন ও সম্পদ নিয়ে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি।”
-সহীহ বুখারী, হাদীস: ৯৬৯
? ব্যাখ্যা:
এটি প্রমাণ করে, বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হলো জিলহজের প্রথম ১০ দিন।
৩. এই দিনগুলোতে ইবাদত আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়:
হাফিজ ইবনে হাজার (রহঃ) বলেন-
এই ১০ দিনের মর্যাদার কারণ হলো, ইসলামের বড় বড় ইবাদত একত্রিত হয়েছে-
? সালাত
? সিয়াম
? সদকা
? হজ
? কুরবানী
? অন্য কোনো সময়ে এত ইবাদত একত্রিত হয় না।
৪. আরাফার দিনের বিশেষ মর্যাদা:
রাসূল ﷺ বলেছেন-
“আরাফার দিনের রোজা পূর্বের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহের কাফফারা।”
-সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬২
? গুরুত্বপূর্ণ:
যারা হজে নেই, তাদের জন্য ৯ জিলহজের রোজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
? দ্বিতীয় পর্ব:
জিলহজের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল-
১. তাওবা ও গুনাহ বর্জন:
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো গুনাহ থেকে ফিরে আসা।
আল্লাহ বলেন-
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ
অর্থঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা কর।”
-সূরা আন-নূর: ৩১
? সালফে সালেহীনদের আমল:
তাঁরা এই দিনগুলো শুরু হওয়ার আগেই নিজেদেরকে গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধ করতেন।
২. বেশি বেশি নফল সালাত আদায়:
? তাহাজ্জুদ
? চাশতের সালাত
? নফল সালাত
? কুরআন তিলাওয়াত
? এসবের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
রাসূল ﷺ বলেছেন-
“বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে।”
-সহীহ বুখারী
৩. রোজা রাখা:
বিশেষত ১-৯ জিলহজ পর্যন্ত রোজা রাখা মুস্তাহাব।
উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রাঃ) বলেন-
“রাসূল ﷺ জিলহজের নয় দিন রোজা রাখতেন।”
-আবূ দাউদ, হাদীস: ২৪৩৭
? বিশেষ করে:
আরাফার রোজা “আরাফার দিনের রোজা দুই বছরের গুনাহ মাফের কারণ।”
-সহীহ মুসলিম
৪. বেশি বেশি তাকবীর, তাহলীল ও যিকির করা:
আল্লাহ বলেন-
وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ
অর্থঃ “তারা যেন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।”
-সূরা হজ্জ: ২৮
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন-
“নির্দিষ্ট দিন” বলতে জিলহজের প্রথম ১০ দিন বুঝানো হয়েছে।
তাকবীরের শব্দ:
الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله
والله أكبر الله أكبر ولله الحمد
? সালফদের আমল:
ইমাম বুখারী (রহঃ) বর্ণনা করেন-
ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা (রাঃ) বাজারে গিয়ে উচ্চস্বরে তাকবীর দিতেন, মানুষও তাকবীর দিত।
৫. কুরআন তিলাওয়াত:
এই দিনগুলোতে কুরআনের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে হবে।
সালফে সালেহীনগণ এই সময় কুরআন খতমের প্রতি গুরুত্ব দিতেন।
৬. সদকা ও দান:
রাসূল ﷺ ছিলেন সবচেয়ে দানশীল ব্যক্তি।
এই ১০ দিনে-
? গরীবদের সাহায্য
? মসজিদে দান
? এতিমদের সহায়তা
? কুরবানীর গোশত বিতরণ
? এসব অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
৭. কুরবানীর প্রস্তুতি ও গুরুত্ব:
আল্লাহ বলেন-
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
অর্থঃ “তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর।”
-সূরা কাউসার: ২
রাসূল ﷺ বলেছেন-
“যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।”
-ইবনে মাজাহ
৮. কুরবানীদাতার জন্য চুল ও নখ না কাটা:
উম্মে সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন-
“যখন জিলহজের চাঁদ দেখা যাবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানীর ইচ্ছা করবে, সে যেন চুল ও নখ না কাটে।”
-সহীহ মুসলিম
? আহলুল হাদীসের বক্তব্য:
এ হাদীসের উপর আমল করা সুন্নাহ।
৯. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা:
? বাবা-মায়ের খেদমত
? আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া
? মানুষের উপকার করা
? এসবও নেক আমল।
১০. দোয়া ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা:
বিশেষত এই দোয়াগুলো বেশি পড়া
? أستغفر الله
? سبحان الله
? الحمد لله
? لا إله إلا الله
? الله أكبر
? তৃতীয় পর্ব:
সালফে সালেহীনদের দৃষ্টিতে এই ১০ দিন-
ইবনে রজব (রহঃ) বলেন- “বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হলো জিলহজের প্রথম ১০ দিন।”
সাঈদ ইবনে জুবাইর (রহঃ) তিনি এই ১০ দিন এলে এত বেশি ইবাদত করতেন যে, প্রায় ক্লান্ত হয়ে যেতেন।
? চতুর্থ পর্ব:
যে ভুলগুলো থেকে বাঁচতে হবে-
১. শুধু ঈদের আনন্দে ব্যস্ত থাকা:
অনেকে পুরো ১০ দিন গাফেল থাকে, শুধু ঈদের দিন ব্যস্ত হয়। এটা ভুল।
২. গান-বাজনা ও অপসংস্কৃতি:
ঈদের নামে হারাম কাজে জড়ানো যাবে না।
৩. কুরবানীকে লোক দেখানো বানানো:
কুরবানী শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে।
আল্লাহ বলেন-
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا
অর্থঃ “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানীর গোশত বা রক্ত; পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
-সূরা হজ্জ: ৩৭
? উপসংহার:
প্রিয় উপস্থিতি,
জিলহজের প্রথম ১০ দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল নেয়ামত। এই দিনগুলো খুব দ্রুত চলে যায়। তাই আমাদের উচিত-
? তাওবা করা
? রোজা রাখা
? তাকবীর বলা
? কুরআন তিলাওয়াত করা
? সদকা করা
? কুরবানীর প্রস্তুতি নেওয়া
? গুনাহ বর্জন করা
“হয়তো এটাই আমাদের জীবনের শেষ জিলহজ।
হয়তো আগামী বছর আমরা এই দিনগুলো পাব না।
তাই আসুন, এই ১০ দিনকে বদলে দেই আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ্যে।”
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মহান দিনগুলোর যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
সংকলনে-
কাজী আসাদ বিন রমজান
-প্রধান শিক্ষক,
দ্যা হলি কুরআন ইসলামিক স্কুল,
কালিতলা, সদর, দিনাজপুর।
রেফারেন্সসমূহ:
সহীহ বুখারী: ৯৬৯
সহীহ মুসলিম: ১১৬২
সহীহ মুসলিম: কুরবানীর আগে নখ-চুল না কাটা
সূরা ফাজর: ১-২
সূরা হজ্জ: ২৮, ৩৭
সূরা কাউসার: ২
সূরা তাওবা: ৩৬
সূরা নূর: ৩১
https://www.youtube.com/watch?v=iAnb6xONnts
Fonuder & Director: Kaji Asad Bin Romjan
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আভাস মাল্টিমিডিয়া