প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
ইসলামের দৃষ্টিতে হত্যা - কাজী আসাদ বিন রমজান
||
ভূমিকা:
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه أجمعين
সম্মানিত উপস্থিত শ্রোতৃবৃন্দ,
আজকের আলোচনার বিষয় অত্যন্ত হৃদয়বিদারক, ভয়াবহ এবং সময়োপযোগী- “ইসলামের দৃষ্টিতে হত্যা”।
বর্তমান পৃথিবীতে হত্যা যেন একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা, মা-বাবার সামনে সন্তান হত্যা, টাকার জন্য মানুষ হত্যা - এসব আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
ইসলাম মানবজীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা ইসলামে পৃথিবীর অন্যতম জঘন্য অপরাধ।
মানব জীবনের মর্যাদা:
আল্লাহ তাআলা বলেন-
“যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল -যদি সে হত্যার বদলা বা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টির কারণে না হয় -তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।” সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২
এই আয়াত প্রমাণ করে -একজন মানুষের জীবন পুরো মানবজাতির সমান মূল্যবান।
রাসূল ﷺ বিদায় হজ্জে বলেছেন-
“তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান -এ দিন, এ মাস ও এ শহরের মতোই পবিত্র।” সহীহ বুখারী: ১৭৩৯, সহীহ মুসলিম: ১৬৭৯
পৃথিবীর প্রথম হত্যা: হাবিল ও কাবিলের ঘটনা:
সম্মানিত ভাইয়েরা,
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম হত্যা সংঘটিত হয়েছিল আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
“আদামের দু’পুত্রের খবর তাদেরকে সঠিকভাবে জানিয়ে দাও। উভয়ে যখন একটি করে কুরবানী হাজির করেছিল তখন তাদের একজনের নিকট হতে কবূল করা হল। অন্যজনের নিকট হতে কবূল করা হল না।
সে বলল, আমি তোমাকে অবশ্য অবশ্যই হত্যা করব। অন্যজন বলল, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের কুরবানী কবূল করেন।”
“আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি আমার দিকে হাত বাড়ালেও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য তোমার দিকে হাত বাড়াব না, আমি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।”
“আমি চাই তুমি আমার ও তোমার পাপের বোঝা বহন কর আর অগ্নিবাসী হয়ে যাও, অন্যায়কারীদের এটাই প্রতিদান।”
“সুতরাং তার নফস তাকে বশ করল তার ভাইকে হত্যা করতে। ফলে সে তাকে হত্যা করল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হল”
“তারপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন, সে মাটি খনন করতে লাগল, সে তার ভাইয়ের লাশ কীভাবে গোপন করবে তা দেখানোর জন্য। সে বলল, ধিক আমাকে! আমি এই কাকটির মতও হতে পারলাম না যাতে আমার ভাইয়ের লাশ গোপন করতে পারি? তাই সে অনুতপ্ত হল।” সূরা আল-মায়িদাহ: ২৭-৩১
কাবিলের কুরবানী কবুল হয়নি, কিন্তু হাবিলের কুরবানী কবুল হয়েছিল। হিংসা ও অহংকারে কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে।
হাবিল বলেছিলেন-
“তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়াও, আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়াব না। আমি আল্লাহকে ভয় করি।” সূরা আল-মায়িদাহ: ২৮
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা:
হিংসা মানুষকে খুনী বানায়
তাকওয়া মানুষকে রক্ষা করে
শয়তান হত্যা সুন্দর করে দেখায়
প্রথম হত্যাকারীর গুনাহ আজও চলমান
রাসূল ﷺ বলেন-
“যখনই কোনো মানুষ অন্যায়ভাবে হত্যা হয়, তার রক্তের পাপের একটি অংশ আদমের প্রথম পুত্রের উপর বর্তায়। কারণ সেই প্রথম হত্যার সূচনা করেছিল।” সহীহ বুখারী: ৩৩৩৫, সহীহ মুসলিম: ১৬৭৭
হত্যা কবীরা গুনাহ:
আল্লাহ বলেন-
যে ব্যক্তি কোন মু’মিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম। যাতে স্থায়ীভাবে থাকবে, তার উপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিসম্পাত। আল্লাহ তার জন্য মহাশাস্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। সূরা আন-নিসা: ৯৩
রাসূল ﷺ বলেন-
“কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং মানুষ হত্যা করা।” সহীহ বুখারী: ৬৮৭১
আরেক হাদীসে এসেছে-
“দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে একজন মুসলিমকে হত্যা করার চেয়েও হালকা।” সুনানে নাসাঈ: ৩৯৮৭
বাংলাদেশে ভয়াবহ শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড:
আজ আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে নিষ্পাপ শিশুদেরও রেহাই নেই।
মাগুরার ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে- ধর্ষণের পর হত্যা।
মিরপুরের ৭ বছরের শিশু রামিসাকে - ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা।
সিলেটে ৪ বছরের শিশু ধর্ষণের পর হত্যা।
ঠাকুরগাঁওয়ের ৪ বছরের শিশু লামিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা।
মুন্সীগঞ্জে ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা।
এসব ঘটনা শুধু আইন ভঙ্গ নয় - এগুলো আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল।
একটি শিশু কী অপরাধ করেছিল?
রাসূল ﷺ শিশুদের প্রতি ছিলেন সবচেয়ে দয়ালু। তিনি সন্তানদের চুমু দিতেন, আদর করতেন, কোলে নিতেন।
আর আজকের মানুষ?
শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করছে!
এরা মানুষ নয়, এরা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।
এরা মানবতার শত্রু।
এরা সমাজের ও পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।
আল্লাহ বলেন-
“তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না।” সূরা আল-আরাফ: ৫৬
শিশু ধর্ষণ ও হত্যা পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ফাসাদের অন্তর্ভুক্ত।
কিয়ামতের দিন হত্যার বিচার:
রাসূল ﷺ বলেছেন-
“কিয়ামতের দিন মানুষের মাঝে সর্বপ্রথম রক্তপাতের বিচার করা হবে।” সহীহ বুখারী: ৬৫৩৩, সহীহ মুসলিম: ১৬৭৮
আরেক হাদীসে এসেছে-
"মুমিন ব্যক্তি তার দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ স্বস্তিতে ও প্রশস্ততায় থাকে, যে পর্যন্ত না সে কোনো হারাম রক্তপাত (অন্যায়ভাবে হত্যা) করে।"
অর্থাৎ, হত্যা এমন গুনাহ যা মানুষের ঈমানকে ধ্বংস করে দেয়। সহীহ বুখারী: ৬৮৬২
মনে আছে কি? "রক্ষক যখন ভক্ষক হয়" দিনাজপুর দশমাইলের ১৪ বছর বয়সী ইয়াসমিন আক্তারের কথা। ১৯৯৫ সালের ২৪শে আগস্ট ঐতিহাসিক একটি ঘটনা, যেখানে ইয়াসমিন আক্তারকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিলে ধর্ষণ ও হত্যা করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
হত্যার ভয়াবহ পরিণতি:
১. দুনিয়াতে অপমান-
খুনীরা কখনো শান্তি পায় না।
তার জীবন ভয়, অস্থিরতা ও অভিশাপে ভরে যায়।
২. কবরের শাস্তি-
হত্যাকারীর জন্য কবরেও কঠিন আযাব রয়েছে।
৩. আখিরাতে জাহান্নাম-
আল্লাহ বলেছেন-
যে ব্যক্তি কোন মু’মিনকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম। যাতে স্থায়ীভাবে থাকবে, তার উপর আল্লাহর ক্রোধ ও অভিসম্পাত। আল্লাহ তার জন্য মহাশাস্তি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। সূরা নিসা: ৯৩
সমাজে হত্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ:
১. আল্লাহভীতি না থাকা-
তাকওয়া উঠে গেলে মানুষ পশুতেও পরিণত হয়।
২. পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতা-
অশ্লীলতা ধর্ষণ ও হত্যার অন্যতম কারণ।
৩. মাদক-
মাদক মানুষকে হিংস্র করে তোলে।
৪. ইসলামী শিক্ষা থেকে দূরে থাকা-
যেখানে কুরআন নেই, সেখানে অপরাধ বাড়বেই।
৫. আইন প্রয়োগের দুর্বলতা-
অপরাধীরা দ্রুত বিচার না পেলে অপরাধ বাড়ে।
ইসলামের সমাধান:
১. তাকওয়া অর্জন-
আল্লাহকে ভয় করতে হবে।
২. সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা দেওয়া-
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই দ্বীন শেখাতে হবে।
৩. পর্দা ও পবিত্রতা বজায় রাখা-
সমাজকে অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করতে হবে।
৪. দ্রুত বিচার কার্যকর করা-
ইসলামে কিসাসের বিধান রয়েছে।
আল্লাহ বলেন-
“কিসাসের মধ্যেই তোমাদের জীবন রয়েছে।” সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৯
অর্থাৎ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করলে সমাজে হত্যা কমে যায়।
সালাফে সালেহীনের দৃষ্টিভঙ্গি:
সালাফে সালেহীনরা হত্যাকে অত্যন্ত ভয় করতেন।
ইবনে উমর (রা.) বলতেন-
“একজন মুমিনকে হত্যা করার চেয়ে দুনিয়া ধ্বংস হওয়া সহজ।”
সালাফরা কখনো অন্যায় রক্তপাতকে সমর্থন করেননি।
আহলুল হাদীসের আকীদা হলো-
নিরপরাধ হত্যা হারাম
সন্ত্রাস হারাম
শিশু হত্যা হারাম
নারী হত্যা হারাম
জুলুম হারাম
যুব সমাজের প্রতি আহ্বান:
প্রিয় যুবক ভাই,
রাগ নিয়ন্ত্রণ করো
হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকো
পর্নোগ্রাফি ছেড়ে দাও
মাদক ছেড়ে দাও
সালাত কায়েম করো
আল্লাহকে ভয় করো
আজ তুমি কাউকে কাঁদালে, কাল তোমাকেও কাঁদতে হবে।
উপসংহার:
সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ,
হত্যা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়।
এটি আল্লাহর আরশ কাঁপিয়ে দেয়।
একটি শিশুর কান্না, একজন মায়ের আহাজারি, একজন বাবার বুকফাটা আর্তনাদ - এগুলো আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়।
আমাদের সমাজকে বাঁচাতে হলে-
কুরআনের পথে ফিরতে হবে
সুন্নাহর পথে ফিরতে হবে
সন্তানদেরকে দ্বীন শেখাতে হবে
অপরাধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে
আল্লাহ আমাদের সমাজকে হত্যা, ধর্ষণ ও জুলুম থেকে হেফাজত করুন।
সমাপনী দোআ:
হে আল্লাহ!
আপনি আমাদের দেশকে সকল ফিতনা, হত্যা, জুলুম ও প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা থেকে হেফাজত করুন।
হে আল্লাহ!
আপনি মুসলিম যুব সমাজকে সংশোধন করুন এবং আমাদের ছেলে-মেয়েদের সকল অনিষ্ট ও অকল্যাণ থেকে নিরাপদ রাখুন।
হে আমাদের রব!
আপনি আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।
আমীন, হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
সংকলনে-
কাজী আসাদ বিন রমজান
-প্রধান শিক্ষক,
দ্যা হলি কুরআন ইসলামিক স্কুল,
কালিতলা, সদর, দিনাজপুর।
https://www.youtube.com/watch?v=E1Dc8dy6CmM
Fonuder & Director: Kaji Asad Bin Romjan
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আভাস মাল্টিমিডিয়া