প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
স্ত্রীকে পরকীয়ার ফিতনা থেকে রক্ষা করার ইসলামি উপায়
কাজী আসাদ বিন রমজান ||
স্ত্রীকে পরকীয়ার ফিতনা থেকে রক্ষা করার ইসলামি উপায়দাম্পত্য জীবন শুধু দুটি মানুষের একসঙ্গে বসবাসের নাম নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বস্ততা ও আল্লাহভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র বন্ধন। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের “পোশাক” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। অর্থাৎ তারা একে অপরের আবরণ, নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও সঙ্গী।বর্তমান সময়ে পরকীয়া একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে অসংখ্য পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সমাজে অশান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরকীয়া কখনোই হঠাৎ করে শুরু হয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবনের অবহেলা, মানসিক দূরত্ব, যোগাযোগের অভাব, পারস্পরিক অযত্ন এবং দুর্বল ঈমান এর পেছনে ভূমিকা রাখে।একজন মুসলিম স্বামীর দায়িত্ব হলো নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেওয়া এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে স্বামীর সান্নিধ্যেই মানসিক ও আবেগিক প্রশান্তি খুঁজে পায়। নিচে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো, যা দাম্পত্য সম্পর্ককে দৃঢ় করতে এবং পরকীয়ার ফিতনা থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে সহায়ক হতে পারে।১. উত্তম আচরণ ও সুন্দর ব্যবহারস্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করা একজন মুসলিম স্বামীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ছোটখাটো ভুলের কারণে কঠোর ভাষা ব্যবহার, অপমান বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। সুন্দর কথা, নম্র আচরণ এবং ক্ষমাশীল মনোভাব দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।২. কঠোরতা ও নির্যাতন থেকে বিরত থাকাশারীরিক বা মানসিক নির্যাতন কখনোই একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। রাগের বশবর্তী হয়ে অপমান বা আঘাত করার পরিবর্তে ভুলত্রুটি হলে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। ভালোবাসা ও সম্মানের পরিবেশেই একটি সম্পর্ক টিকে থাকে।৩. দাম্পত্য চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দেওয়াস্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক চাহিদা ও অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একে অপরের আবেগ, অনুভূতি এবং বৈবাহিক অধিকারের প্রতি যত্নবান হওয়া সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। অবহেলা ও উদাসীনতা অনেক সময় মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি করে, যা ভবিষ্যতে নানা সমস্যার কারণ হতে পারে।৪. একসঙ্গে সময় কাটানোব্যস্ত জীবনের মাঝেও স্ত্রীর জন্য সময় বের করা প্রয়োজন। সুযোগ হলে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, একসঙ্গে হাঁটা বা কিছু সময় গল্প করা সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় রাখে। নারীরা সাধারণত স্বামীর সঙ্গ ও মনোযোগকে অত্যন্ত মূল্য দেয়।৫. ভালোবাসার ছোট ছোট প্রকাশউপহার সবসময় মূল্যবান হতে হবে এমন নয়। একটি ফুল, একটি বই, কিংবা আন্তরিক কোনো উপহারও ভালোবাসার প্রকাশ হতে পারে। ছোট ছোট যত্ন ও উপহার অনেক সময় সম্পর্ককে আরও গভীর ও মধুর করে তোলে।৬. নিজের ব্যক্তিত্ব ও উপস্থাপনার প্রতি যত্নবান হওয়াযেমন একজন স্বামী তার স্ত্রীকে সুন্দর ও পরিপাটি দেখতে পছন্দ করেন, তেমনি স্ত্রীও তার স্বামীকে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি দেখতে ভালোবাসেন। নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ, সৌন্দর্যচর্চা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া দাম্পত্য আকর্ষণ বৃদ্ধি করে।৭. পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে শিক্ষা দেয়। শরীর, পোশাক ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নবান হওয়া শুধু সুস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, দাম্পত্য সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অপরিচ্ছন্নতা অনেক সময় অজান্তেই দূরত্ব তৈরি করে।৮. মুখের দুর্গন্ধ ও অপছন্দনীয় অভ্যাস থেকে দূরে থাকাধূমপানসহ এমন অভ্যাস, যা সঙ্গীর কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে, তা পরিহার করা উচিত। বিশেষ করে মুখের দুর্গন্ধ বা শরীরের অপ্রীতিকর গন্ধ সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।৯. নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখাকাজের প্রয়োজনে দূরে থাকলেও যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। ফোনে কথা বলা, খোঁজখবর নেওয়া, অনুভূতি ভাগাভাগি করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকার চেষ্টা করা দাম্পত্য সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে। এতে একাকিত্ব কমে এবং পারস্পরিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।১০. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করাআল্লাহভীতি এবং সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান একজন মানুষকে পাপ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। পরিবারে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা, ইসলামী বইপত্র অধ্যয়ন এবং দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তোলা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। যে পরিবারে ঈমান ও তাকওয়ার চর্চা থাকে, সেখানে শয়তানের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম থাকে।১১. স্ত্রীর অনুভূতির মূল্য দেওয়াঅনেক সময় স্ত্রী তার কষ্ট, উদ্বেগ কিংবা প্রত্যাশার কথা প্রকাশ করতে চান। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অনুভূতির মূল্য দেওয়া এবং সমস্যাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা সম্পর্ককে গভীর করে। একজন নারী যখন অনুভব করেন যে তার স্বামী তাকে বুঝতে চেষ্টা করছেন, তখন তার হৃদয়ে স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আরও বৃদ্ধি পায়।১২. প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করামানুষ প্রশংসা পেতে ভালোবাসে। স্ত্রীর পরিশ্রম, ত্যাগ ও সংসারের জন্য তার অবদানের প্রশংসা করা উচিত। একটি আন্তরিক “ধন্যবাদ” বা “তুমি ভালো করেছ” অনেক সময় তার হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে এবং সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে তোলে।১৩. পারিবারিক নিরাপত্তা ও প্রশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করাএকটি নারী সাধারণত এমন একটি ঘর চায় যেখানে সে নিরাপদ, সম্মানিত ও মূল্যবান অনুভব করবে। স্বামী যদি ঘরে শান্তি, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন, তাহলে স্ত্রী বাইরের কারও কাছে মানসিক আশ্রয় খুঁজতে আগ্রহী হবে না।১৪. একে অপরের জন্য দোয়া করাদাম্পত্য জীবনের সফলতার জন্য দোয়ার বিকল্প নেই। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একে অপরের হেদায়েত, ঈমানের দৃঢ়তা, চরিত্রের পবিত্রতা এবং জান্নাতের সঙ্গী হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী ও সফল হতে পারে না।পরিমার্জনায়: আইন উদ্দিন আইনী
Fonuder & Director: Kaji Asad Bin Romjan
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আভাস মাল্টিমিডিয়া