ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: বাংলাদেশীদের নির্লজ্জ উন্মাদনা এবং সতর্কবার্তা
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশীদের সীমাহীন উন্মাদনা, অসভ্যতা এবং নির্বুদ্ধিতা সুলভ কার্যক্রম দেখল সমগ্র বিশ্ব।
মৃত্যুর মিছিল:
ভাবতে অবাক লাগে, ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা তো দূরে থাক, ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০। যেই বাংলাদেশিরা দিনরাত আফ্রিকার উগান্ডাকে ট্রল করে তারাও বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০০ ধাপ এগিয়ে আছে। (তাদের অবস্থান ৮৯তম)।
অথচ এই খেলাকে কেন্দ্র করে ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৪ বা ১৫ জন বাংলাদেশী মৃত্যুবরণ করেছে। [সূত্র ৭১ টিভি]।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালেও সহিংসতা ও দুর্ঘটনায় দেশে ২৩ জনের মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। যা খুবই উদ্বেগজনক।
এদের কেউ মারা গেছে, বিশ্বকাপে তার প্রিয় দেশের পতাকা টাঙাতে গিয়ে উপর থেকে পড়ে, কেউ বিদ্যুৎ পিষ্ট হয়ে, কেউ প্রচণ্ড উত্তেজনা বসত হার্ট অ্যাটাক করে, কেউ প্রিয় দলের হারে দুঃখে-কষ্টে আত্মহত্যা করে আবার কেউবা অন্য দলের সমর্থকদের চাপাতির আঘাতে।
মারামারি ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ইত্যাদিতে আহত হয়েছে কয়েক হাজার।
পতাকা কাণ্ড:
এই তথাকথিত ফুটবল ভক্তদের কেউ একজন জায়গা-জমি বিক্রি করে সাত কিলোমিটার লম্বা দীর্ঘ পতাকা টাঙিয়েছে, (মাগুরার আমজাদ, জার্মান ভক্ত), কেউ গরু বিক্রি করে পতাকা টাঙিয়েছে।
বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, শহর-নগর-বন্দরে, বাড়ির ছাদ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ ইত্যাদি সর্বত্র বিদেশি পতাকায় সয়লাব হয়ে গেছে।
চতুর্দিকে বিভিন্ন দেশের বাহারি পতাকার দৃশ্য দেখে মনে হয় না, এটা বাংলাদেশ। যদিও দেশের আইনে বিশেষ নির্দেশনা ছাড়া যত্রতত্র বিদেশী পতাকা টাঙ্গানো নিষিদ্ধ। কিন্তু এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেমন নির্বিকার, তেমনি এ সব খেলা ভক্তরাও দেশের আইনকে থোড়ায় তোয়াক্কা করছে।
নির্লজ্জ উন্মাদনা:
নামধারী মুসলিমরা ফজর নামাজে না উঠলেও খেলা দেখার জন্য ভোর রাতে টিভির সামনে চাতক পাখির মত বসে থাকে। অথচ অন্য সময় ১০-১১ টা না হলে এদের সকাল হয় না।
গভীর রাতে যুবক-যুবতীরা একাকার হয়ে যেভাবে চিৎকার, হৈ হুল্লোড় এবং লাফালাফি করেছে তাতে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এরা বাংলাদেশের নাগরিক━এরা মুসলিম।
কিছু মানুষের কার্যক্রম ও কথাবার্তা সমগ্র জাতির জন্য লজ্জা জনক।
এদের কেউ একজন খেলোয়াড়কে ‘বাপ’ ডাকছে, কেউ ‘সহোদর ভাই’ বলে পরিচয় দিচ্ছে। কেউ আবার তার ‘স্ত্রী’ বলে পরিচয় দিতেও দ্বিধা করছে না।
কোন কোন মেয়ে ভক্ত বলছে, অমুক খেলোয়াড়কে পেলে সে সরাসরি বিছানায় নিতে চায়, কেউবা তার গার্ল ফ্রেন্ড হতে চায়, কেউ তাকে বিয়ে করতে চায় এক ঘণ্টার জন্য হলেও!
কী লজ্জাজনক অবস্থা আমাদের মুসলিম মেয়েদের!! ভাবতেও গা ঘিনঘিন করে উঠে।
খেলায় অতিভক্তিতে ধর্মের অবমাননা:
সবচেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় হল-এই বিবেকহীনরা খেলায় নিজেদের ধর্ম ও আত্মপরিচয়ও ভুলে বসেছে। যেমন:
কিছু নামধারী মুসলিম অবলীলায় বলছে, “অমুক খেলোয়াড়ের ভালোবাসায় আমরা ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করতেও রাজি”,
কেউ বলছে, “অমুক খেলোয়াড়ের সাথে হাসিমুখে জাহান্নামে যাওয়াও গর্বের বিষয়”,
কেউ বলছে, অমুকের একটা গোল দেখা সারারাত প্রার্থনা করার থেকেও উত্তম।
কেউ বা তার প্রিয় দলের বিজয় কামনায় সেজদায় লুটোপুটি খাচ্ছে।
আবার কেউ দুই হাত তুলে প্রিয় দলকে জেতার জন্য আল্লাহর কাছে আকুতি-মিনতি করছে।
কেউ খেলা দেখে এমনভাবে কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে হয়ত তার বাবা-মা মারা গেলেও এতটা কান্না করবে না।
এদের এই ঘিলু হীন আবেগ দেখে সম্ভবত খোদ শয়তানও লজ্জায় মরে।
জাতির সাথে নির্লজ্জ উপহাস!
সর্বোপরি একটি দৃশ্য জাতিকে হতভম্ব করেছিল। তা হল, যে সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রচণ্ড বন্যার কবলে অসংখ্য বনি আদম পানিতে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে দিন কাটাচ্ছিল তখন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নির্লজ্জের মত বিশাল টিভি স্ক্রিনের সামনে ছাতার নিচে বসে ফুটবল উপভোগ করছিল আর আনন্দে-উত্তেজনায় চিৎকার করছিল।
জাতির সাথে এর থেকে নির্লজ্জ উপহাস আর কী হতে পারে!
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাজে অবস্থা ছিল, আগামী দিনের জাতির প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের।
প্রবাসেও বাংলাদেশীদের উন্মাদনা:
প্রবাসের মাটিতেও বাংলাদেশীদেরকে গায়ে আর্জেন্টিনা━ব্রাজিল বা বিভিন্ন দেশের জার্সি পড়ে বাংলাদেশীদের কে রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়। অথচ অন্য কোন দেশের মানুষের মধ্যে তেমন একটা চোখে পড়ে না।
সেদিন সৌদি আরবে দেখলাম, বিশ্বকাপের খেলা দেখে একদল বাংলাদেশী চিৎকার এবং হইচই করতে করতে একটা ভবন থেকে রাস্তায় বের হয়ে এলো। তাদের গায়ে বিদেশী টিমের জার্সি। আর এই অসভ্যদের চিৎকার শুনে অন্যান্য দেশের মানুষরা রাস্তায় বের হয়ে অবাক বিস্ময়ে বাংলাদেশীদের অবস্থা দেখল।
এই হচ্ছে বাংলাদেশীদের অবস্থা!
ভাবতে লজ্জা লাগে, বাংলাদেশ এমন একটি আত্ম মর্যাদাহীন, অপদার্থ ও নির্লজ্জ প্রজন্মকে বুকে ধারণ করেছে।
সতর্কবার্তা:
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুনিয়াবি খেল-তামাশায় মত্ত হয়ে প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যেতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন,
وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ ۖ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
"পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ও কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়। যারা মুত্তাকি, তাদের জন্য পরকালের আবাসই শ্রেয়। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না?" [সূরা আনআম: ৩২]
পার্থিব ভোগ-বিলাসে মত্ত ও অর্থহীন আশায় ডুবে থাকা মানুষদের পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ ۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
"তাদেরকে খেতে দিন এবং ভোগ করতে দিন ও আশা তাদেরকে উদাসীন করে রাখুক; অচিরেই তারা জানতে পারবে।"
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ বিচারের কাঠগড়ায় মানুষকে তার জীবন-যৌবন এবং অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে অবশ্যই প্রশ্নের সম্মুখীন করবেন। অথচ আমরা আখিরাতকে ভুলে দুনিয়ার এসব তুচ্ছ খেল-তামাশায় হাবুডুবু খাচ্ছি।
হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে হেদায়েত দাও, আমাদের প্রতি রহম করো এবং ধ্বংসের আগে তওবা করার তওফিক দান করো। আমিন।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব
আপনার মতামত লিখুন