'ইকামতে দ্বীন' (দ্বীন প্রতিষ্ঠা) এর প্রকৃত অর্থ এবং একটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যার অপনোদন:
▬▬▬▬▬

▬▬▬▬▬
বর্তমানে আমাদের সমাজে 'দ্বীন কায়েম' প্রসঙ্গে যথেষ্ট বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিধায় বিষয়টি স্পষ্ট করা আবশ্যক মনে করছি।
তাই প্রথমে আমরা দ্বীন কায়েম প্রসঙ্গে কুরআনের ব্যাপক আলোচিত একটি আয়াত পেশ করে যুগে যুগে মুফাসসিরগণ তার কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা তুলে ধরব। তারপর দ্বীন কায়েম মানে কি ইসলামী হুকুমত (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠা না কি অন্য কিছু এবং কিভাবে প্রকৃত দ্বীন কায়েম করা সম্ভব তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।
وما توفيقى إلا بالله
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
"তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি কর না।" (সূরা শুরা: ১৩)
উপরোক্ত আয়াতে ‘দ্বীন কায়েম’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা মুফাসিরগণের বক্তব্যের আলোকে তুলে ধরা হল:
أن أقيموا الدين وهو توحيد الله وطاعته ، والإيمان برسله وكتبه وبيوم الجزاء ، وبسائر ما يكون الرجل بإقامته مسلما
'দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করা'র অর্থ হল: "আল্লাহর তাওহীদ ও আনুগত্য করা, নবী-রাসূল ও প্রতিদান দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং মুসলিম হিসেবে যা কিছু কর্তব্য সেগুলো বাস্তবায়ন করা।" (তাফসির কুরতুবী, সূরা শুরার ১৩ নং আয়াতের তাফসীর)
أن اعملوا به على ما شرع لكم وفرض
"দ্বীন কায়েম করো" অর্থ: তোমাদের জন্য যা শরিয়ত সম্মত ও ফরয করা হয়েছে তদনুযায়ী আমল করো।" (তাফসীরে ত্বাবারী, সূরা শুরার ১৩ নং আয়াতের তাফসীর)
الدين الذي جاءت به الرسل كلهم هو : عبادة الله وحده لا شريك له ، كما قال : ( وما أرسلنا من قبلك من رسول إلا نوحي إليه أنه لا إله إلا أنا فاعبدون ) [ الأنبياء : 25 ] . وفي الحديث : " نحن معشر الأنبياء أولاد علات ديننا واحد " أي : القدر المشترك بينهم هو عبادة الله وحده لا شريك له ، وإن اختلفت شرائعهم ومناهجهم
"সকল নবী-রাসূল যে দ্বীন নিয়ে আগমন করেছিলেন তা হল, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
“আপনার পূর্বে আমি যে রসুলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।" (সূরা আম্বিয়া: ২৫)
আর হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে:
نحن معشر الأنبياء أولاد علات ديننا واحد
‘আমরা নবীরা হলাম বৈমাত্রেয় ভাইস্বরূপ। আমাদের সকলের দ্বীন একটাই।’’ (সহীহ বুখারী) অর্থাৎ যুগে যুগে সকল নবী-রসুলের মধ্যে যে বিষয়টি এক ও অভিন্ন ছিল তা হল, লা শারিক এক আল্লাহর ইবাদত করা-যদিও তাদের শরিয়ত ও পদ্ধতিগত বিষয়ে ভিন্নতা ছিল।"(তাফসিরে ইবনে কাসির,শুরা শুরা এর ১৩ নং আয়াতের তাফসির)
أمركم أن تقيموا جميع شرائع الدين أصوله وفروعه، تقيمونه بأنفسكم، وتجتهدون في إقامته على غيركم، وتعاونون على البر والتقوى ولا تعاونون على الإثم والعدوان
" তিনি আদেশ করেছেন যে,তোমরা দ্বীনের মূল ও শাখা গত বিষয়গুলো নিজেরা বাস্তবায়ন করবে এবং অন্যদের উপর বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে। তোমরা নেকি ও আল্লাহ ভীরুতার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের বিষয়ে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে না।" [তাইসীরিল কারীমির রাহমান ফী তাফসীরে কালামিল মান্নান (তাফসীরে বিন সাদী নামে সুপরিচিত) লেখক: আব্দুর রহমান বিন নাসের আস সাদী রহ.]
এ ছাড়া বিখ্যাত হাদিসে জিবরিল এ ইসলাম ও তার ৫টি রোকন, ঈমান ও তার ৬টি রোকন এবং ইহসানকে ‘দ্বীন’ বলা হয়েছে। (উমর ইবনুল খাত্তাব রা., আবু হুরায়রা রা. প্রমূখ হতে সহিহ বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত হাদিস)
সুতরাং একজন মানুষ যদি ইসলাম ও ঈমানের রোকনগুলো বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি ইহসান পর্যায়ে উপনিত হতে পারে তাহলে এর চেয়ে বড় দ্বীন কায়েম আর কী হতে পারে?
মোটকথা, দ্বীন প্রতিষ্ঠা বলতে বুঝায়, তাওহীদ বা একাত্মবাদ বাস্তবায়ন করা তথা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলার এবাদত করা এবং তার বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধগুলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেনে চলা।
সুতরাং শরিয়তের ছোট-বড় সকল প্রকার কাজই দ্বীন কায়েমের অন্তর্ভুক্ত। যেমন:
আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি বিশেষ মতবাদ হল, ইকামতে দ্বীন মানে কেবল ইসলামী হুকুমত (রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠা করা। আর নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ ইত্যাদি হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রেনিং মাত্র। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হলে 'ইকামতে দ্বীন' হল না। এদের মতে, "সব ফরজের বড় ফরজ দ্বীন কায়েম তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।" আর নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ, হালাল, হারাম ইত্যাদি ইসলামের অন্যান্য বিধিবিধান এর চেয়ে কম মর্যাদার-সবই এর চেয়ে নিম্নস্তরের। যার কারণে এ মতবাদে বিশ্বাসী লোকদেরকে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতা গ্রহণের জন্য যতটা চেষ্টা-পরিশ্রম করতে এবং যত বেশি উদগ্রীব দেখা যায় তাওহীদ শিক্ষা, সুন্নাহর প্রতি আমল, আকিদার পরিশুদ্ধতা, শিরক ও বিদআত বর্জন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণে সালাত, সিয়াম, হজ্জ ইবাদত-বন্দেগি ইত্যাদি ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ ও তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না।
আমরা বলব, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা করা নি:সন্দেহে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যাপারে কোনও দ্বিমত নাই। কিন্তু শুধু এই একটি বিষয়ের মধ্যে দ্বীন কায়েমকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া নিতান্ত বিভ্রান্তি মূলক এবং কুরআনের অপব্যাখ্যা-যেমনটি ইতোপূর্বে উল্লেখিত তাফসীর কারকদের তাফসীর থেকে প্রতিয়মান হয়েছে।
দ্বীন কায়েম সম্ভব একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকায়। এর বিকল্প কোনো থিওরি ও মতাদর্শ দ্বারা সম্ভব নয়।
যাহোক, এ ক্ষেত্রে তাঁর তরিকা ছিল, প্রথমত: আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের তাওহীদের আলোকে মানুষের চিন্তার জগতকে পরিবর্তন করা এবং শিরকি ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত করা। তাই তো তিনি মক্কী জীবনের ১৩টি বছর কেবল কালিমাতুত তাওহীদ তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর বাণীকে জনে জনে মানুষের কর্ণ কুহুরে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। কারণ মানুষের মনে এই আকীদা-বিশ্বাস সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া ব্যতিরেকে কখনই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি ইসলামের অন্যান্য বিধিবিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত হয়েছেন।
যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের প্রধান ও প্রথম দায়িত্ব ছিল, তাওহীদ তথা এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহ্বান করা এবং তাগুত থেকে মানুষকে সতর্ক করা। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّـهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ۖ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন করো।" (সূরা আন নহল: ৩৬)
আল্লাহ ছাড়া যত কিছুর ইবাদত করা হয় তাকেই তাগুত বলা হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রখ্যাত সাহাবী মুআয বিন জাবাল রা.কে ইয়েমেনে প্রেরণের সময় তিনি সর্বপ্রথম তাওহীদ দ্বারা দাওয়াতি কার্যক্রম শুরু করতে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তারপর পর্যায়ক্রমে সালাত, সাওম, যাকাত ইত্যাদি দ্বীনের বিধিবিধানের দিকে আহ্বান করতে বলেছেন।
এই তাওহীদের জ্ঞানার্জন করাই প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের উপর সর্বপ্রথম ও সর্ব বৃহৎ ফরজ। এর চেয়ে বড় ফরজ অন্য কিছু নেই।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও বুজ দান করতঃ তদনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬◉◉◉▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব