দিনাজপুর    সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩
আভাস মাল্টিমিডিয়া

দাস-দাসী প্রথা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন তা বিলুপ্ত করা হয়নি?



দাস-দাসী প্রথা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন তা বিলুপ্ত করা হয়নি?

দাস-দাসী প্রথা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন তা বিলুপ্ত করা হয়নি?

ইসলাম পৃথিবীতে দাস-দাসী প্রথা সৃষ্টি করেনি বরং আরবে এবং তৎকালীন বিশ্বে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি ও সামাজিক প্রথা হিসেবে বিদ্যমান ছিল। ইসলাম একে সরাসরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে এমন এক বৈপ্লবিক সংস্কার ও মুক্তির পথ উন্মোচন করেছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এই প্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি।

১. কেন এটি সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি?

ইসলাম কেন একতরফাভাবে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করেনি। তার মূল কারণ ছিল, এটি একটি আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক (Reciprocal) বিষয়। এর সাথে সামরিক ও কৌশলগত বিষয় জড়িয়ে আছে। কেননা তৎকালীন যুদ্ধনীতি অনুযায়ী, কাফেররা যুদ্ধে জয়ী হয়ে মুসলিম সৈন্যদের দাস হিসেবে গ্রহণ করত। যদি মুসলিমরা একতরফাভাবে এই প্রথা নিষিদ্ধ করত। তবে শত্রুরা মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের দাস বানিয়ে শ্রম ও শক্তিতে বলীয়ান হতো।

কিন্তু মুসলিমরা সেই কৌশলগত সুবিধা হারাত। এতে প্রকারান্তরে পরাজয়ের চাবিকাঠি শত্রুদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।

তবে হ্যাঁ, ইসলামের মূলনীতি হলো - শত্রুপক্ষ যদি যুদ্ধে জয়ী হয়ে কাউকে দাস না বানানোর বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয় তবে মুসলিমদের জন্যও সেই চুক্তি মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ

"হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ (চুক্তি) পূর্ণ করো।" [সূরা মায়িদাহ: ১]

তিনি আরো বলেছেন:

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا

"আর তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) কৈফিয়ত তলব করা হবে।" [সূরাইসরা: ৩৪]

২. দাস মুক্তির ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশনা ও সওয়াব:

ক. ইসলাম দাস মুক্তিকে কেবল একটি মানবিক কাজ নয় বরং মহান ইবাদত এবং পরকালীন মুক্তির মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে।

মহান আল্লাহ বলেন,

فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ - وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ - فَكُّ رَقَبَةٍ

"অতঃপর সে ধর্মের দুর্গম ঘাঁটিতে প্রবেশ করেনি। আপনি কি জানেন সেই দুর্গম ঘাঁটি কী? তা হলো কোনো দাসকে মুক্ত করা।" [সূরা বালাদ: ১১-১৩]

খ. দাসমুক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ:

আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন,

"مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُؤْمِنَةً، أَعْتَقَ اللَّهُ بِكُلِّ إِرْبٍ مِنْهَا إِرْبًا مِنْهُ مِنَ النَّارِ"

"যে ব্যক্তি কোনো মুমিন দাসকে মুক্ত করবে, আল্লাহ তার (দাসের) প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে এই ব্যক্তির প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন।" [সহীহ বুখারী: ৬৭১৫, সহীহ মুসলিম: ১৫০৯]

৩. ইসলামে দাস মুক্তির বিশেষ পদ্ধতিসমূহ:

ইসলাম আইনি ও সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্তির বহুমুখী পথ তৈরি করেছে:

ক. মুকাতাবা (চুক্তিভিত্তিক মুক্তি):

কোনো দাস স্বাধীন হতে চাইলে মালিকের সাথে আর্থিক চুক্তির আইনি অধিকার। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন:

وَالَّذِينَ يَبْتَغُونَ الْكِتَابَ مِمَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا

"তোমাদের মালিকানাধীন দাসদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়, তাদের সাথে চুক্তি করো যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ দেখতে পাও।" [সূরা নূর: ৩৩]

খ. উম্মে ওয়ালাদ (সন্তানবতী দাসীর মর্যাদা):

যদি কোনো দাসীর গর্ভে তার মালিকের সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তবে তাকে 'উম্মে ওয়ালাদ' বলা হয়। তাকে আর বিক্রি করা যায় না এবং মালিকের মৃত্যুর সাথে সাথেই সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ স্বাধীন হয়ে যায়।

গ. কাফফারা বা বাধ্যতামূলক মুক্তি:

কসম ভঙ্গ, ভুলবশত মানুষহত্যা বা রমজান মাসে দিনের বেলা স্ত্রী সহবাসের মতো ভুলের কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ইসলাম দাস মুক্তিকে বাধ্যতামূলক করেছে। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ

"অতঃপর একজন মুমিন দাস মুক্ত করা আবশ্যক।" [সূরা নিসা: ৯২]

ঘ. পবিত্র কুরআনে জাকাতের আটটি খাতের একটি নির্ধারণ করা হয়েছে দাস মুক্তির জন্য। [সূরা তাওবা: ৬০]

৪. দাস দাসীর প্রতি মানবিক আচরণের নির্দেশ:

যতক্ষণ কেউ অধীনস্থ থাকত তার অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

ক. প্রখ্যাত সাহাবি আবু যার (রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন,

"إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ، جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ، فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلَا تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ"

"তারা (অধীনস্থরা) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। অতএব যার ভাই তার অধীনে থাকে সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং তাকে তাই পরায় যা সে নিজে পরে। আর তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না যা তাদের সাধ্যের বাইরে; যদি এমন কাজ দাও তবে তোমরা নিজেরাও তাদের সাহায্য করো।" [সহীহ বুখারী: ৩০, সহীহ মুসলিম: ১৬৬১] (মান: সহিহ)

খ. ক্ষমা ও সহনশীলতা:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمْ نَعْفُو عَنِ الْخَادِمِ فَصَمَتَ ثُمَّ أَعَادَ عَلَيْهِ الْكَلاَمَ فَصَمَتَ فَلَمَّا كَانَ فِي الثَّالِثَةِ قَالَ: "اعْفُوا عَنْهُ فِي كُلِّ يَوْمٍ سَبْعِينَ مَرَّةً"

"আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসুল! আমরা অধীনস্থকে কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন: প্রতিদিন তাকে সত্তরবার ক্ষমা করবে।" [সুনানে আবু দাউদ: ৫১৬৪, মান: হাসান সহিহ]

গ. আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

"لِلْمَمْلُوكِ طَعَامُهُ وَكِسْوَتُهُ، وَلَا يُكَلَّفُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا يُطِيقُ"

"অধীনস্থ ব্যক্তির জন্য রয়েছে তার খাদ্য ও পোশাক। আর তাকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না।" [সহীহ মুসলিম: ১৬৬২] (মান: সহিহ)

৫. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অঙ্গীকার:

বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে দাসপ্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামের সেই 'দ্বিপাক্ষিক চুক্তির নীতি' অনুযায়ী, যেহেতু এখন বিশ্বব্যাপী কোনো জাতিই যুদ্ধবন্দীকে দাস বানায় না, তাই এই চুক্তি মেনে চলা ইসলামের দৃষ্টিতেও আবশ্যক।

- Slavery Convention (1926): বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুসমর্থন জানিয়ে দাসপ্রথা ও দাস ব্যবসার সম্পূর্ণ বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

- সংবিধানের বিধান:

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম বা দাসত্ব আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

উপসংহার:

ইসলামে দাসপ্রথা কোনো স্থায়ী বিধান ছিল না বরং তা ছিল তৎকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত ব্যবস্থা। ইসলাম একদিকে যেমন দাসদের মানবিক অধিকার ও ভ্রাতৃত্বের মর্যাদা নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে বহুমুখী আইনি সংস্কারের মাধ্যমে তাদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে এই প্রথা বিলুপ্ত হওয়া ইসলামের সেই উদার ও মানবিক লক্ষ্যকেই পূর্ণতা দান করেছে।

আল্লাহু আলাম।
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

বিষয় : দাস-দাসী প্রথা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন তা বিলুপ্ত করা হয়নি?

আপনার মতামত লিখুন

আভাস মাল্টিমিডিয়া

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


দাস-দাসী প্রথা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন তা বিলুপ্ত করা হয়নি?

প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দাস-দাসী প্রথা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন তা বিলুপ্ত করা হয়নি?

ইসলাম পৃথিবীতে দাস-দাসী প্রথা সৃষ্টি করেনি বরং আরবে এবং তৎকালীন বিশ্বে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি ও সামাজিক প্রথা হিসেবে বিদ্যমান ছিল। ইসলাম একে সরাসরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে এমন এক বৈপ্লবিক সংস্কার ও মুক্তির পথ উন্মোচন করেছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এই প্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি।

১. কেন এটি সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি?

ইসলাম কেন একতরফাভাবে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করেনি। তার মূল কারণ ছিল, এটি একটি আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক (Reciprocal) বিষয়। এর সাথে সামরিক ও কৌশলগত বিষয় জড়িয়ে আছে। কেননা তৎকালীন যুদ্ধনীতি অনুযায়ী, কাফেররা যুদ্ধে জয়ী হয়ে মুসলিম সৈন্যদের দাস হিসেবে গ্রহণ করত। যদি মুসলিমরা একতরফাভাবে এই প্রথা নিষিদ্ধ করত। তবে শত্রুরা মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের দাস বানিয়ে শ্রম ও শক্তিতে বলীয়ান হতো।

কিন্তু মুসলিমরা সেই কৌশলগত সুবিধা হারাত। এতে প্রকারান্তরে পরাজয়ের চাবিকাঠি শত্রুদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।

তবে হ্যাঁ, ইসলামের মূলনীতি হলো - শত্রুপক্ষ যদি যুদ্ধে জয়ী হয়ে কাউকে দাস না বানানোর বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয় তবে মুসলিমদের জন্যও সেই চুক্তি মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ

"হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ (চুক্তি) পূর্ণ করো।" [সূরা মায়িদাহ: ১]

তিনি আরো বলেছেন:

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا

"আর তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) কৈফিয়ত তলব করা হবে।" [সূরাইসরা: ৩৪]

২. দাস মুক্তির ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশনা ও সওয়াব:

ক. ইসলাম দাস মুক্তিকে কেবল একটি মানবিক কাজ নয় বরং মহান ইবাদত এবং পরকালীন মুক্তির মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে।

মহান আল্লাহ বলেন,

فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ - وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ - فَكُّ رَقَبَةٍ

"অতঃপর সে ধর্মের দুর্গম ঘাঁটিতে প্রবেশ করেনি। আপনি কি জানেন সেই দুর্গম ঘাঁটি কী? তা হলো কোনো দাসকে মুক্ত করা।" [সূরা বালাদ: ১১-১৩]

খ. দাসমুক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ:

আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেছেন,

"مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُؤْمِنَةً، أَعْتَقَ اللَّهُ بِكُلِّ إِرْبٍ مِنْهَا إِرْبًا مِنْهُ مِنَ النَّارِ"

"যে ব্যক্তি কোনো মুমিন দাসকে মুক্ত করবে, আল্লাহ তার (দাসের) প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে এই ব্যক্তির প্রতিটি অঙ্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবেন।" [সহীহ বুখারী: ৬৭১৫, সহীহ মুসলিম: ১৫০৯]

৩. ইসলামে দাস মুক্তির বিশেষ পদ্ধতিসমূহ:

ইসলাম আইনি ও সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্তির বহুমুখী পথ তৈরি করেছে:

ক. মুকাতাবা (চুক্তিভিত্তিক মুক্তি):

কোনো দাস স্বাধীন হতে চাইলে মালিকের সাথে আর্থিক চুক্তির আইনি অধিকার। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন:

وَالَّذِينَ يَبْتَغُونَ الْكِتَابَ مِمَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا

"তোমাদের মালিকানাধীন দাসদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়, তাদের সাথে চুক্তি করো যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ দেখতে পাও।" [সূরা নূর: ৩৩]

খ. উম্মে ওয়ালাদ (সন্তানবতী দাসীর মর্যাদা):

যদি কোনো দাসীর গর্ভে তার মালিকের সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তবে তাকে 'উম্মে ওয়ালাদ' বলা হয়। তাকে আর বিক্রি করা যায় না এবং মালিকের মৃত্যুর সাথে সাথেই সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ স্বাধীন হয়ে যায়।

গ. কাফফারা বা বাধ্যতামূলক মুক্তি:

কসম ভঙ্গ, ভুলবশত মানুষহত্যা বা রমজান মাসে দিনের বেলা স্ত্রী সহবাসের মতো ভুলের কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ইসলাম দাস মুক্তিকে বাধ্যতামূলক করেছে। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ

"অতঃপর একজন মুমিন দাস মুক্ত করা আবশ্যক।" [সূরা নিসা: ৯২]

ঘ. পবিত্র কুরআনে জাকাতের আটটি খাতের একটি নির্ধারণ করা হয়েছে দাস মুক্তির জন্য। [সূরা তাওবা: ৬০]

৪. দাস দাসীর প্রতি মানবিক আচরণের নির্দেশ:

যতক্ষণ কেউ অধীনস্থ থাকত তার অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

ক. প্রখ্যাত সাহাবি আবু যার (রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন,

"إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ، جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ، فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلَا تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ"

"তারা (অধীনস্থরা) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। অতএব যার ভাই তার অধীনে থাকে সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং তাকে তাই পরায় যা সে নিজে পরে। আর তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না যা তাদের সাধ্যের বাইরে; যদি এমন কাজ দাও তবে তোমরা নিজেরাও তাদের সাহায্য করো।" [সহীহ বুখারী: ৩০, সহীহ মুসলিম: ১৬৬১] (মান: সহিহ)

খ. ক্ষমা ও সহনশীলতা:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَمْ نَعْفُو عَنِ الْخَادِمِ فَصَمَتَ ثُمَّ أَعَادَ عَلَيْهِ الْكَلاَمَ فَصَمَتَ فَلَمَّا كَانَ فِي الثَّالِثَةِ قَالَ: "اعْفُوا عَنْهُ فِي كُلِّ يَوْمٍ سَبْعِينَ مَرَّةً"

"আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসুল! আমরা অধীনস্থকে কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন: প্রতিদিন তাকে সত্তরবার ক্ষমা করবে।" [সুনানে আবু দাউদ: ৫১৬৪, মান: হাসান সহিহ]

গ. আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) থেকে বর্ণিত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

"لِلْمَمْلُوكِ طَعَامُهُ وَكِسْوَتُهُ، وَلَا يُكَلَّفُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا يُطِيقُ"

"অধীনস্থ ব্যক্তির জন্য রয়েছে তার খাদ্য ও পোশাক। আর তাকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না।" [সহীহ মুসলিম: ১৬৬২] (মান: সহিহ)

৫. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের অঙ্গীকার:

বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে দাসপ্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামের সেই 'দ্বিপাক্ষিক চুক্তির নীতি' অনুযায়ী, যেহেতু এখন বিশ্বব্যাপী কোনো জাতিই যুদ্ধবন্দীকে দাস বানায় না, তাই এই চুক্তি মেনে চলা ইসলামের দৃষ্টিতেও আবশ্যক।

- Slavery Convention (1926): বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুসমর্থন জানিয়ে দাসপ্রথা ও দাস ব্যবসার সম্পূর্ণ বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

- সংবিধানের বিধান:

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম বা দাসত্ব আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

উপসংহার:

ইসলামে দাসপ্রথা কোনো স্থায়ী বিধান ছিল না বরং তা ছিল তৎকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত ব্যবস্থা। ইসলাম একদিকে যেমন দাসদের মানবিক অধিকার ও ভ্রাতৃত্বের মর্যাদা নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে বহুমুখী আইনি সংস্কারের মাধ্যমে তাদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে এই প্রথা বিলুপ্ত হওয়া ইসলামের সেই উদার ও মানবিক লক্ষ্যকেই পূর্ণতা দান করেছে।

আল্লাহু আলাম।
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল


আভাস মাল্টিমিডিয়া

Fonuder & Director: Kaji Asad Bin Romjan Head Office: The Holy Quran Islamic School Kalitola, Sadar, Dinajpur, Bangladesh. Call: 01710-649751 ই-মেইল: avasmultimedia@gmail.com
কপিরাইট © ২০১৯-২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আভাস মাল্টিমিডিয়া
দাস-দাসী প্রথা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কেন তা বিলুপ্ত করা হয়নি?
0:00 0:00
1.0x
নোটিশ