দু‘আ: আদব, আহকাম ও ফযীলত -আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ
[১৮ শা‘বান, ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খখালেদ আল-মুহান্না হাফিযাহুল্লাহ। উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ড. আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]প্রথমখুৎবা:সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা চাই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।অতঃপর, আজকের আলোচনা এমন এক ইবাদত সম্পর্কে, যা আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন এবং পছন্দ করেন। যে সম্পর্কে তিনি তাঁর মহান কিতাবে আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁর সম্মানিত রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ যাকে কল্যাণ দিতে চান, তাকে এই ইবাদতের পথে পরিচালিত করেন, এর দিকে পথনির্দেশ করেন এবং এর দ্বারসমূহ তার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ফলে সে এর ছায়াতলে প্রশান্তি লাভ করে, এর প্রাঙ্গণে নফসের নেয়ামত অনুভব করে এবং এর আশ্রয়ে মুক্তি ও স্বস্তি খুঁজে পায়।এটি এমন এক ইবাদত, যার সাথে রাসূলগণ ও নবীগণ সর্বদা সম্পৃক্ত ছিলেন এবং যার উপর নেককার ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ নির্ভর করেছেন। ফলে তারা এর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করেছেন, এর মাধুর্য আস্বাদন করেছেন এবং এর বরকত প্রত্যক্ষ করেছেন।হে আল্লাহর বান্দাগণ! দু‘আ হলো ইবাদতের মূল, এটি শুধু ইবাদতের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ এবং সুস্পষ্ট প্রকাশ নয়; বরং দু‘আই প্রকৃত ইবাদত। কারণ দু‘আর প্রকৃত অর্থ হলো আল্লাহর নিকট নিজের সম্পূর্ণ মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা এবং আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই এই মর্মে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্ভরহীন ঘোষণা করা। আর এটিই প্রকৃত বন্দেগীর বৈশিষ্ট্য। তাছাড়া দু‘আর মধ্যে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করার অর্থও নিহিত আছে এবং তাঁর প্রতি দানশীলতা ও অনুগ্রহের গুণ আরোপ করার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।নু‘মান ইবনু বাশীর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দু‘আই হলো ইবাদত’। অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করেন, ‘আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (গাফির, ৪০/৬০)।[1]বান্দা যখন একমাত্র তার রবের কাছেই দু‘আ করে, তখন সেটিই তার বিশুদ্ধ তাওহীদপন্থি হওয়ার পরিচায়ক। এটি তার রবের প্রতি ভালোবাসা এবং স্রষ্টার প্রতি তার গভীর নির্ভরতার প্রকাশ। বান্দার তাওহীদ যত দৃঢ় হয়, তার দু‘আও তত বেশি, বিস্তৃত ও গভীর হয়। ফলে প্রভুর কাছে চাওয়া তার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে এবং দু‘আ তার নিয়মিত অভ্যাস ও স্থায়ী আমলে পরিণত হয়।সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যার কাছে মহান আল্লাহ তার দু‘আকে প্রিয় করে দেন, তাকে দু‘আ কবুল হওয়ার কারণসমূহ জানিয়ে দেন, দু‘আর আদব শিক্ষা দেন এবং তাকে দু‘আর প্রতিবন্ধকতা ও কবুল হওয়ার বাধাসমূহ থেকে দূরে রাখেন।আর যে ব্যক্তি তার রবকে সেভাবে ডাকে, যেভাবে তার রব পছন্দ করেন—এর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেন, তাকে নিজের নিকটবর্তী করেন, মর্যাদা দান করেন, আশ্রয় দেন এবং তাকে সম্মানিত করেন। যে ব্যক্তি দু‘আর তাওফীক্ব লাভ করে, তার জন্য মূলত কবুল হওয়াই নির্ধারিত হয়। যখন বান্দাকে দু‘আর চাবিকাঠি দেওয়া হয়, তখন মহান আল্লাহ তার জন্য কবুলের দরজা খুলে দিতে চান। উমার ফারূক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি দু‘আ কবুল হওয়া নিয়ে চিন্তা করি না, বরং আমি দু‘আ করার চিন্তা করি। কারণ যখন আমাকে দু‘আর তাওফীক্ব দেওয়া হয়, তখন তার সঙ্গে কবুল হওয়াও থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ভালোবাসেন যে, তাঁর বান্দা অধিক পরিমাণে দু‘আ করবে। কেননা তার দু‘আর ফল সুনিশ্চিত।নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম দু‘আ করার সময় কোনো গুনাহের অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের দু‘আ না করলে অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তাকে এ তিনটির একটি দান করেন— (১) হয়তো তাকে তার কাঙ্ক্ষিত সুপারিশ দুনিয়ায় দান করেন, অথবা (২) তা তার পরকালের জন্য জমা রাখেন, অথবা (৩) তার অনুরূপ কোনো অকল্যাণ বা বিপদাপদকে তার থেকে দূরবর্তী করে দেন। ছাহাবীগণ বললেন, তবে তো আমরা অনেক বেশি লাভ করব। তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ এর চেয়েও বেশি দেন।[2]বান্দা যত বেশি তার রবের কাছে মিনতি করে, আল্লাহ তাকে তত বেশি ভালোবাসেন, তার নিকটবর্তী করেন এবং তাকে দান করেন। কারণ বান্দা সেই রবের কাছেই প্রার্থনা করে, যিনি তাকে প্রতিপালন করেছেন, তাকে নেয়ামত দিয়েছেন এবং তার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।অতএব, বান্দার উচিত প্রবল আগ্রহ নিয়ে দু‘আ করা এবং বেশি বেশি প্রার্থনা করা। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে, তখন ফেরদাউস জান্নাত চাইবে। কারণ সেটি হচ্ছে সবচেয়ে প্রশস্ত ও সবচেয়ে উঁচু জান্নাত। আর দয়ালু (আল্লাহর) আরশটি এরই উপর অবস্থিত। এই ফিরদাউস থেকেই জান্নাতের ঝর্ণাগুলো প্রবাহিত’।[3]হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ ভালোবাসেন যে, বান্দা নিজের কাছে সম্মানিত থাকবে, কিন্তু তার রবের সামনে বিনয়ী হবে এবং মানুষের কাছে চাওয়া থেকে সংযমী থাকবে, কিন্তু তার প্রভুর কাছে অবশ্যই প্রার্থনা করবে। সে মানুষের কাছে অমুখাপেক্ষী থাকবে, কিন্তু তার রবের দরবারে নিজেকে অসহায় ও মুখাপেক্ষী হিসেবে উপস্থিত করবে। বান্দার জন্য এটি খুবই নিন্দনীয় যে, সে মানুষের কাছে চাইতে যায়; অথচ তার প্রভুর কাছেই তার সব চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা রয়েছে। কত এমন বান্দা আছে যাকে তার রব কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন, যাতে তাকে তাঁর প্রশস্ত দরবারের দিকে ফিরিয়ে আনেন, তার বিনম্র দু‘আ শুনেন এবং তার অশ্রুসজল চোখ দেখতে পান।হে ঈমানদারগণ! মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের শিখিয়েছেন তারা কীভাবে তাঁর কাছে দু‘আ করবে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। অতএব, তোমরা সেই নামগুলোর মাধ্যমে তাঁকে ডাকো এবং তাদের পরিত্যাগ করো, যারা তাঁর নামসমূহের ব্যাপারে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত, অচিরেই তার প্রতিফল পাবে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৮০)।অতএব, বান্দা যখন দু‘আর মধ্যে তার প্রভুর কাছে তাঁর নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে বিনয়াবনত হয়ে প্রার্থনা করে, যথাস্থানে সেই নামগুলো ব্যবহার করে এবং নামের অর্থ জেনে সেই নাম অনুযায়ী দু‘আ করে, তখন তা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হয় এবং দু‘আ কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি হয়।বিশেষ করে যখন বান্দা তার রবের দিকে সম্পূর্ণ অসহায়ত্ব নিয়ে ফিরে আসে, তাঁর প্রতি আন্তরিক হয়, তাঁর সাহায্য কামনা করে, তাঁর সামনে আদব বজায় রাখে, পবিত্র অবস্থায় থাকে, দুই হাত প্রসারিত করে ক্বেবলামুখী হয়; তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার দু‘আ কবুল করেন, তার কষ্ট দূর করে দেন এবং তার জন্য তাঁর রহমতের দরজাগুলো খুলে দেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘কে সেই সত্তা, যিনি বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির দু‘আ কবুল করেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং কষ্ট দূর করে দেন?’ (আন-নামল, ২৭/৬২)।হে মুসলিমগণ! যে ব্যক্তি চায় তার দু‘আ কবুল হোক, তার মধ্যে মূলত দুটি বিষয় থাকা জরুরী। এর মধ্যে প্রথমটি হলো আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দেওয়া এবং তাঁর আনুগত্যের উপর আত্মসমর্পণ করা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, নিশ্চয় আমি নিকটবর্তী। আমি দু‘আকারীর দু‘আ কবুল করি, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে, যাতে তারা সঠিক পথ লাভ করে’ (আল-বাকারা, ২/১৮৬)।দ্বিতীয়টি হলো দু‘আর সময় আল্লাহর সাথে আদব রক্ষা করা। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে বিনয়সহ ও গোপনে ডাকো’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৫৫)।হে আল্লাহর বান্দাগণ! দু‘আর মধ্যে সর্বোত্তম হলো যে দু‘আগুলোতে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ একত্রে কামনা করা হয়। যার শব্দগুলো থাকে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক হয়। আমাদের মা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন দু‘আ পছন্দ করতেন যা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ব্যাপক অর্থবহ হতো এবং তিনি অন্য সকল প্রকার দু‘আ পরিহার করতেন।[4]আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময়ই এ দু‘আ করতেন, رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে দুনিয়ায় এবং আখেরাতে কল্যাণ দান করো। আর জাহান্নামের আযাব হতে বাঁচাও’ (আল-বাক্বারা, ২/২০১)।[5]দু‘আর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করা, আল্লাহর সামনে দীনতা ও ভগ্নতা প্রদর্শন করা এবং দু‘আ গোপনে করা। এটি আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত নির্দেশ পালনের জন্য যে, ‘তোমরা তোমাদের রবকে বিনয়সহ ও গোপনে ডাকো। নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৫৫)। যেমনটা মহান আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেছেন, ‘যখন তিনি তাঁর রবকে নিঃশব্দে ডাকলেন’ (মারইয়াম, ১৯/৩)।দু‘আ কবুলের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি আদব হলো তাড়াহুড়ো না করা। তাড়াহুড়োর অর্থ হলো দু‘আর ফল দ্রুত পাওয়ার আশা করা এবং দু‘আ কবুল হতে দেরি হওয়াকে অপছন্দ করা। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের দু‘আ কবুল হয়ে থাকে, যদি সে তাড়াহুড়ো না করে এবং বলে যে, আমি দু‘আ করলাম; কিন্তু আমার দু‘আ তো কবুল হলো না’।[6]যে বান্দা তার রবের কাছে কল্যাণের আশায় দু‘আ করে এবং সঠিক পথে চলতে চায়, তার জন্য উচিত নয় যে, সে এমন ইবাদতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। কারণ যত বেশি সে দু‘আ করবে, তত বেশি সে তার রবের নিকটবর্তী হবে এবং তার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হবে। তাছাড়া সে তার দু‘আর জন্য ছওয়াব লাভ করে এবং তার দু‘আর পরিমাণ অনুযায়ী তার থেকে অমঙ্গল দূর করা হয়।হে আল্লাহর বান্দাগণ! এটি দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, বান্দা দু‘আর জন্য প্রচেষ্টা করে; কিন্তু তার দু‘আ কবুল হয় না। এর কারণ হলো সে দু‘আর কিছু নিষিদ্ধ বিষয় বা কবুল হওয়ার প্রতিবন্ধকতায় নিমজ্জিত হয়। আর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন দু‘আ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন, যা কবুল করা হয় না।জেনে রাখুন! দু‘আ কবুলের সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক প্রতিবন্ধকতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হারাম উপার্জন বা হারাম খাদ্য গ্রহণ করা। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যে দু‘আ কবুলের সম্ভাব্য সব উপায় একত্র করেছিল— দীর্ঘ সফর, শারীরিক ক্লান্তি ও নাজেহাল অবস্থা, আকাশের দিকে হাত প্রসারিত করা এবং রবের নামে বারবার মিনতি করা। কিন্তু তার খাদ্য ছিল হারাম, পোশাক ছিল হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দু‘আ তিনি কীভাবে কবুল করতে পারেন?’[7] অর্থাৎ তার এই অবস্থায় দু‘আ কবুল হওয়া কতই না দূরের বিষয়!দু‘আ কবুল না হওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো দু‘আকারীর তার দু‘আ ও প্রার্থনায় আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা এবং সীমালঙ্ঘন করা। আর আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।দু‘আয় সীমালঙ্ঘনের অনেক রূপ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো এমন দু‘আ করা, যাতে শিরক রয়েছে। যেমন- কেউ নবী বা অলীদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে; অথচ দু‘আ একটি ইবাদত, যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও জন্য করা বৈধ নয়। অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ডাকে এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকেও ডাকে, সে আল্লাহর সাথে শিরক করল। অথচ আল্লাহ সেই সব শিরক থেকে পবিত্র ও মহান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না’ (আল-জিন, ৭২/১৮)।দু‘আয় সীমালঙ্ঘনের আরেকটি রূপ হলো গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দু‘আ করা। যেমন- কেউ তার রবের কাছে কোনো অন্যায় কাজ সহজ করে দেওয়ার জন্য বা কোনো হারাম কাজ করার জন্য প্রার্থনা করে অথবা কোনো নির্দোষ ব্যক্তির উপর ধ্বংস, লাঞ্ছনা, অভিশাপ বা তার সম্পদ ধ্বংসের জন্য দু‘আ করে। আর যদি সেই দু‘আ নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে হয়, তবে তার গুনাহ আরও বেশি গুরুতর হয়।দু‘আয় সীমালঙ্ঘনের আরেকটি রূপ হলো অতিরিক্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে চাওয়া। একবার আব্দুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পুত্র (ইয়াযীদ)-কে বলতে শুনলেনে যে, ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার নিকট জান্নাতের ডান পার্শ্বস্থ শ্বেত প্রাসাদ প্রার্থনা করি, যখন আমি সেখানে প্রবেশ করব। আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! তুমি জান্নাত কমনা করো এবং দোযখ হতে মুক্তি প্রার্থনা করো। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ‘অদূর ভবিষ্যতে এই উম্মতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হবে, যারা পবিত্রতা অর্জন ও দু‘আর মধ্যে অতিরঞ্জিত করবে’।[8]দু‘আয় সীমালঙ্ঘনের আরেকটি রূপ হলো অতিরিক্ত উচ্চৈঃস্বরে দু‘আ করা বা চিৎকার করা। এই কাজের নিন্দনীয় দিক প্রমাণের জন্য এটিই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা এই কাজ সম্পাদনকারীর প্রতি সন্তুষ্ট নন আর এমন দু‘আ থেকে কীভাবে কল্যাণ আশা করা যায়! মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে বিনয়সহ ও গোপনে ডাকো; নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৫৫)।আরও একটি সীমালঙ্ঘন হলো দু‘আর জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্থানকে বিশেষভাবে নির্ধারণ করা। যেমন- কবরস্থান, নবী বা নেককার ব্যক্তিদের নিদর্শনের কাছে গিয়ে দু‘আ করা এবং মনে করা যে, সেখানে দু‘আ করা অন্য স্থানের চেয়ে বেশি উত্তম; অথচ এর স্বপক্ষে কুরআন বা সুন্নাহতে কোনো প্রমাণ নেই।بارَك اللهُ لي ولكم في القرآن العظيم، ونفعني وإيَّاكم بما فيه من الآيات والذِّكْر الحكيم.দ্বিতীয় খুৎবা:সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। তিনি মানুষের জন্য (রহমতের) একটি দরজা উন্মুক্ত করেছেন, তাদেরকে দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং দু‘আ কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল এবং তিনি নবীগণের মধ্যে সর্বশেষ। আল্লাহ তাঁর উপর, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সৎ ও পরহেযগার ছাহাবীদের উপর শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন।অতঃপর, হে আল্লাহর বান্দাগণ! সৌভাগ্যবান সেই বান্দা, যে তার প্রতিপালকের কাছে দু‘আ করার জন্য সম্মানিত সময় ও উত্তম অবস্থাগুলো বেছে নেয় এবং সর্বোত্তম দু‘আগুলো তালাশ করে। সে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য রাতের শেষ অংশকে নির্ধারণ করে, যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। সে আযান ও ইক্বামতের মধ্যবর্তী সময়ে তার প্রভুর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করে, জুমআর দিনের শেষ মুহূর্তে এবং নিজের ছালাতের সিজদার মধ্যেও দু‘আ করে।আর সম্মানিত ও ফযীলতপূর্ণ সময়গুলোর মধ্যে রয়েছে রামাযানের শেষ দশ দিন, যিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন এবং ইবাদতসমূহ সম্পন্ন হওয়ার পর, যেমন- হজ্জ সম্পন্ন করার পরে। এছাড়াও ছালাতের শেষ অংশে, বিশেষ করে সালাম ফিরানোর আগে দু‘আ করা। যেমনটি আমাদের নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় করতেন।আর বান্দার জন্য সেসব অবস্থায় দু‘আ করা উত্তম, যখন বান্দা তার অন্তরের মধ্যে স্বচ্ছতা অনুভব করে, নিয়্যতের মধ্যে আন্তরিকতা থাকে, আল্লাহর দিকে তার একনিষ্ঠ মনোযোগ থাকে এবং তার আগ্রহ সত্য ও আন্তরিক হয়। এমন অবস্থায় সে সর্বোত্তম ও ব্যাপক অর্থবহ দু‘আগুলোকে তালাশ করে।হে ঈমানদারগণ! সর্বোত্তম ও সর্বাধিক পরিপূর্ণ দু‘আ হলো পবিত্র কুরআনে বর্ণিত দু‘আগুলো। কারণ আল্লাহ তাআলা নিজেই এগুলো উচ্চারণ করেছেন, তাঁর বান্দাদেরকে এগুলো দিয়ে প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাঁর মনোনীত শ্রেষ্ঠ রাসূলগণের বিনীত প্রার্থনার বর্ণনা হিসেবে সেগুলো উল্লেখ করেছেন। এই দু‘আগুলোর মধ্যে কিছু দু‘আ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন।হে মুসলিমগণ! আপনারা আজকের এই দিনে বেশি বেশি দরূদ ও সালাম পাঠ করুন সেই রহমতস্বরূপ প্রেরিত মহান নেয়ামত আমাদের নবী, আমাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব ও আমাদের নেতা মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর। [1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪২। [2]. আহমাদ, হা/১১১৪৯; মিশকাত, হা/২২৫৯। [3]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪২৩; মিশকাত, হা/৩৭৮৭। [4]. ছহীহুল জামে‘, হা/৪৯৪৯। [5]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৯০। [6]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩৪০। [7]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫। [8]. আবূ দাঊদ, হা/৯৬।