দিনাজপুর    সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩
আভাস মাল্টিমিডিয়া

বৃষ্টি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত -আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ



বৃষ্টি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত -আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ

[২০ রজব, ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ আব্দুল্লাহ আল-বুআইজান হাফিযাহুল্লাহ। উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ড. আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথম খুৎবা:

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। সকল প্রশংসা তাঁরই যিনি সক্ষমতা প্রদান ও অসংখ্য নেয়ামতের মাধ্যমে আমাদের অনুগ্রহ করেছেন। সকল কৃতজ্ঞতা তাঁরই জন্য, যিনি তাঁর অগণিত অনুগ্রহ ও দান দ্বারা আমাদের সিক্ত করেছেন। এছাড়াও বিশ্বজগতে তিনি যে সকল নিদর্শন স্থাপন করেছেন, বিশেষ করে তিনি যে মহান দানসমূহ দ্বারা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন তার জন্য তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর সত্তা ও গুণাবলিতে তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল ও সর্বশেষ প্রেরিত নবী। মহান আল্লাহ তাঁর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, ছাহাবীগণ ও তাঁর নেককার সহচরদের উপর শান্তি ও বরকত অবতীর্ণ করুন।

অতঃপর, নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর বাণী আর সর্বোত্তম পথনির্দেশ হলো মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথনির্দেশ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে বিদআত বা নবসৃষ্ট বিষয় আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমি আপনাদের আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি। আমি আপনাদের তাক্বওয়ার উপর অবিচল থাকা, নিজের নফসের হিসাব নেওয়া এবং প্রবৃত্তির বিরোধিতা করার উপদেশ দিচ্ছি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেকেই চিন্তা করে দেখুক, আগামীকালের জন্য সে কী (পুণ্য কাজ) অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি খবর রাখেন’ (আল-হাশর, ৫৯/১৮)।

হে মানুষ! পানি আল্লাহর মহান নেয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম। কারণ এটি প্রতিটি জীবিত সত্তার সৃষ্টির মূল উপাদান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম’ (আল-আম্বিয়া, ২১/৩০)।

পানি হলো জীবনের ভিত্তি এবং পরিবেশের সেই উপাদান, যা সকল সৃষ্টির প্রয়োজন, যা ছাড়া মানুষ, পশু ও উদ্ভিদ কিছুই টিকে থাকতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন যাতে আছে তোমাদের জন্য পানীয় আর তাতে জন্মে বৃক্ষলতা, যা তোমাদের পশুগুলোকে খাওয়াও। তিনি তা দিয়ে তোমাদের জন্য জন্মান শস্য, যায়তূন, খেজুর, আঙুর ও সর্বপ্রকার ফল। এতে চিন্তাশীল মানুষদের জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (আন-নাহল, ১৬/১০-১১)।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! পানি হলো পবিত্রতার মাধ্যম আর পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। পবিত্রতা ছালাত ও বহু ইবাদতের পূর্বশর্ত। আমরা পানির মাধ্যমেই ওযূ ও গোসল সম্পন্ন করি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই তাঁর (বৃষ্টিরূপী) অনুগ্রহের পূর্বে সুসংবাদ হিসেবে বায়ু পাঠিয়ে দেন আর আমি আকাশ থেকে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করি। যা দিয়ে আমি মৃত যমীনকে জীবিত করে তুলি এবং তৃষ্ণা নিবারণ করি আমার সৃষ্টির অন্তর্গত অনেক জীবজন্তুর ও মানুষের’ (আল-ফুরক্বান, ২৫/৪৮-৪৯)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর তিনি আকাশ হতে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলেন তোমাদেরকে তা দিয়ে পবিত্র করার জন্য’ (আল-আনফাল, ৮/১১)।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! বৃষ্টি হলো আল্লাহ তাআলার অন্যতম মহান নেয়ামত, যা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে অপরিহার্য করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা নিরাশ হয়ে পড়লে তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন। আর তিনিই তো অভিভাবক, প্রশংসিত’ (আশ-শূরা, ৪২/২৮)।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা বৃষ্টির জন্য নির্দিষ্ট সময় ও পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন এবং তার জন্য একটি প্রতীক্ষিত মৌসুমও রেখেছেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখ না আল্লাহ মেঘমালাকে চালিত করেন, অতঃপর সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন, অতঃপর সেগুলোকে স্তূপীকৃত করেন, অতঃপর তুমি তার মধ্য থেকে পানির ধারা বের হতে দেখতে পাও, অতঃপর তিনি আকাশে স্থিত মেঘমালার পাহাড় থেকে শিলা বর্ষণ করেন, অতঃপর তিনি যাকে ইচ্ছে তা দিয়ে আঘাত করেন আর যার কাছ থেকে ইচ্ছে তা সরিয়ে নেন। তার বিদ্যুতের চমক দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়’ (আন-নূর, ২৪/৪৩)।

হে মানুষ! যখন বৃষ্টি হতে দেরি হয়, তখন মানুষের উপর ভয় ও বিপদের চাপ বেড়ে যায়, দুর্ভিক্ষ ও কষ্ট নেমে আসে, ফসল ও গাছপালা নষ্ট হয়ে যায় আর ঝরনা ও কূপগুলো শুকিয়ে যায়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, তোমরা ভেবে দেখেছ কি যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভের তলদেশে চলে যায়, তাহলে তোমাদেরকে কে এনে দেবে প্রবহমান পানি?’ (আল-মুলক, ৬৭/৩০)।

পূর্বের যুগে নবীগণের উপস্থিতিতেই মানুষের উপর দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল। তারা মানুষকে এর ক্ষতি ও বিপদ থেকে বাঁচার পথ দেখিয়েছেন। এমনকি মহান আল্লাহ কিছু জাতিকে বহু বছরের দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ঘাটতির মাধ্যমে পাকড়াও করেছেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে দু‘আ করেছিলেন, যেন তিনি তাঁর উম্মতকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস না করেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর সে প্রার্থনা কবুল করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি পাকড়াও করেছি ফেরাউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফলাদির ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৩০)।

আর যখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য কল্যাণ চান, তখন রহমত নেমে আসে। অতঃপর বৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বান্দাদের সাহায্য করেন, যাতে জনপদ সিক্ত হয়। এতে পৃথিবী তার শোভা ধারণ করে ও সজ্জিত হয়, আনন্দের সুসংবাদ প্রকাশ পায় এবং তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! নেয়ামতের শোকর আদায় করা ফরয আর এর কারণেই নেয়ামত অব্যাহত থাকে এবং স্থায়ী হয়। আর এসব নেয়ামতের প্রতিদান হিসেবে সত্যিকারের প্রশংসা ও খাঁটি আনুগত্য প্রদর্শন করাই হলো এসব নেয়ামতের পূর্ণ শোকর আদায় করা। কেননা নেয়ামতের শোকর আদায় করা হলে তা স্থায়ী হয় এবং বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হলে তা কেড়ে নেওয়া হয় এবং বন্ধ হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব। আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’ (ইবরাহীম, ১৪/৭)।

অতএব, আপনারা আল্লাহকে স্মরণ করুন, তিনি আপনাদের স্মরণ করবেন। তাঁর নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য তাঁর শোকর আদায় করুন, তাহলে আল্লাহ আপনাদেরকে আরো বৃদ্ধি করে দেবেন। কাজেই আসুন! আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি তাঁর সর্বময় মহান রহমতের জন্য, যার কল্যাণ সর্বত্র বিস্তৃত। রহমতের বৃষ্টি প্রয়োজনের সময়ে বর্ষণ হওয়ায় শস্যসমূহ সজীব হয়েছে এবং অন্তরসমূহ আনন্দিত হয়েছে। অতএব, আমরা তাঁর নিকট তাঁর অনুগ্রহের স্থায়িত্ব কামনা করি।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের প্রমাণ হলো, বান্দা সকল নেয়ামতকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করবে, তাঁর আনুগত্য করার মাধ্যমে সেগুলোর প্রতিদান দিবে এবং সেই নেয়ামতগুলোকে আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক কাজে ব্যয় করবে। এছাড়াও বান্দার উচিত এসব নেয়ামতকে আল্লাহর কাছে তওবা ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের কারণ বানানো। আর এ নেয়ামতকে পাপ ও অবাধ্যতা পরিত্যাগ করে তাঁর কাছেই ফিরে আসা এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার করার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা জরুরী। কেননা নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের কারণেই নেয়ামত স্থায়ী হয়, বরকত নাযিল হয় এবং তাঁর পক্ষ থেকে বৃষ্টি নেমে আসে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল। (তোমরা তা করলে) তিনি অজস্র ধারায় তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তোমাদেরকে ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদীনালা’ (নূহ, ৭১/১০-১২)।

হে লোকসকল! নিশ্চয়ই বৃষ্টি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত এক মহান নিদর্শন, যা তাঁর অপরিসীম ক্ষমতা ও কার্যকর প্রজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বৃষ্টি নাযিলের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও উপদেশ আর এতে আছে এক ঈমানী বার্তা, যা অন্তরকে জাগ্রত করে এবং মৃত্যু, ধ্বংস, পুনরুত্থান, হিসাব ও প্রতিদান দিবসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অনুর্বর ভূমিতে বৃষ্টি যে জীবন সঞ্চার করে, তা মৃত্যুর পর জীবনের সঞ্চার, শুষ্কতার পর উদ্ভিদ জন্মানো, কঠোরতার পর সচ্ছলতা আসার এক স্পষ্ট ও বাস্তব প্রমাণ, যা আমাদেরকে মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেননা যে ভূমি আগে ছিল নিস্তেজ ও অনুর্বর; বৃষ্টির ফলে সেটিই আন্দোলিত হয়, স্ফীত হয় এবং সব রকমের মনোমুগ্ধকর উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর আরেকটি নিদর্শন হলো এই যে, তুমি যমীনকে দেখতে পাও শুষ্ক-অনুর্বর, অতঃপর যখন আমি তার উপর পানি বর্ষণ করি, তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। নিশ্চয়ই যিনি যমীনকে জীবিত করেন তিনি মৃতদেরও জীবিতকারী। নিশ্চয় তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’ (ফুছছিলাত, ৪১/৩৯)।

بارَك اللهُ لي ولكم في القرآن العظيم، ونفعني وإيَّاكم بما فيه من الآيات والذِّكْر الحكيم.

দ্বিতীয় খুৎবা:

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য তাঁর অসীম অনুগ্রহের কারণে। আর তাঁর দান ও তাওফীক্বের জন্য তাঁরই প্রতি কৃতজ্ঞতা। অতঃপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি, তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি, তাঁর ছাহাবীগণের প্রতি এবং তাঁর অনুসারী ও সাহায্যকারীদের প্রতি।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! অনেক মানুষ ছুটি ও অবকাশের সময় প্রকৃতি, বনভূমি কিংবা উদ্যানসমূহে সময় কাটাতে সফরে বের হতে আগ্রহী হয়। একজন মুসলিমের জন্য জরুরী হলো সফরে বের হওয়ার সময় অবকাশ যাপনের শারঈ বিধানসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং সংশ্লিষ্ট আদব-আখলাক মেনে চলা।

সফরে বের হওয়ার ‍গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান ও আদব হলো পরিবারের সদস্যদের বিদায় জানানো, বাহনে আরোহণ করা এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দু‘আ পড়া। যেমন- ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথাও সফরের উদ্দেশ্যে তাঁর উটে আরোহণের সময় তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন, এরপর এই দু‘আ পাঠ করতেন, سُبْحَانَ الَّذِى سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِى سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِى السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِى الأَهْلِ اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِى الْمَالِ وَالأَهْلِ ‘পবিত্র মহান সেই সত্তা, যিনি একে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফরে আমরা তোমার নিকট কল্যাণ, তাক্বওয়া ও তোমার সন্তুষ্টি রয়েছে এমন কাজের তাওফীক্ব চাই। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফর আমাদের জন্য সহজ করে দাও এবং এর দূরত্ব কমিয়ে দাও। হে আল্লাহ! তুমিই (আমাদের) সফরসঙ্গী এবং পরিবারের তত্ত্বাবধানকারী। হে আল্লাহ! তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি সফরের কষ্ট, দুঃখজনক দৃশ্য এবং ফিরে এসে সম্পদ ও পরিবারের ক্ষতিকর পরিবর্তন থেকে’। এরপর তিনি যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখনও উপরিউক্ত দু‘আ পড়তেন এবং এর সাথে যোগ করতেন,آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ ‘আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী এবং আমাদের প্রতিপালকের ইবাদতকারী ও প্রশংসাকারী’।[1]

সফরের আদবসমূহের মধ্যে আরো হলো সৎ সঙ্গী নির্বাচন করা এবং একা একা ভ্রমণ না করা। কেননা সৎ সঙ্গী আল্লাহর আনুগত্যের জন্য সহায়ক হয় এবং শয়তান ও পদস্খলন থেকে রক্ষা করে। যেমন- ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যদি লোকেরা একা সফরে কী ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি; তবে কোনো আরোহী রাতে একাকী সফর করত না।[2]

এছাড়াও সফরের আদবের মধ্যে রয়েছে ফরয ইবাদতসমূহ নির্ধারিত সময়ে যথাযথভাবে আদায় করার প্রতি যত্নবান হওয়া। তবে শরীআত সফরকারীর জন্য রুখছত দিয়েছেন, যদি তার সফর কছরের দূরত্বের পরিমাণ হয়, তাহলে সে চার রাকআতের ছালাত ক্বছর করতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছালাত একত্রে (জমা) আদায় করতে পারবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তোমরা যমীনে সফর করবে, তখন তোমাদের ছালাত কছর করাতে কোনো দোষ নেই’ (আন-নিসা, ৪/১০১)। অনুরূপভাবে শরীআত মোজার উপর মাসাহ করার অনুমতি দিয়েছে, মুক্বীমের জন্য এক দিন এক ও রাত, আর মুসাফিরের জন্য তিন দিন ও তিন রাত। তবে শর্ত হলো সে যেন পূর্ণ পবিত্রতার অবস্থায় সেগুলো পরিধান করে থাকে। আর যে ব্যক্তি অসুস্থতা বা এমন কোনো অক্ষমতার কারণে পানি ব্যবহার করতে অক্ষম হয় অথবা তীব্র শীতের কারণে পানি ব্যবহারে ক্ষতির আশঙ্কা করে, তার জন্য শরীআত তায়াম্মুম করার অনুমতি দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাক অথবা যদি তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে অথবা তোমরা যদি স্ত্রী সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও; তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো। সুতরাং তোমাদের মুখ ও হাত তা দ্বারা মাসাহ করো’ (আল-মায়েদা, ৫/৬)।

আর শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের মধ্যে আরো রয়েছে ভ্রমণকারীদের কষ্ট না দেওয়া এবং বিরক্ত না করা। তাদের সম্মান ও গোপনীয়তার প্রতি দৃষ্টি সংযত রাখা, তাদের ব্যক্তিগত বিষয় থেকে বিরত থাকা, তাদের চলাচলের রাস্তা ও পথঘাটে দাঁড়িয়ে বাধা সৃষ্টি না করা এবং এ উদ্দেশ্যে নির্ধারিত জনসাধারণের সুবিধা, সরঞ্জাম ও সেবাসমূহ নষ্ট না করা।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে হেদায়াত দান করুন। আমাদের অন্তরে ঈমানকে প্রিয় ও শোভিত করে দিন। কুফর, অবাধ্যতা ও পাপকে আমাদের কাছে অপছন্দনীয় করে দিন আর আমাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন- আমীন!

 [1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪২।

 [2]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৯৮।

বিষয় : বৃষ্টি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত -আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ

আপনার মতামত লিখুন

আভাস মাল্টিমিডিয়া

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬


বৃষ্টি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত -আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬

featured Image

[২০ রজব, ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ আব্দুল্লাহ আল-বুআইজান হাফিযাহুল্লাহ। উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ড. আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথম খুৎবা:

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। সকল প্রশংসা তাঁরই যিনি সক্ষমতা প্রদান ও অসংখ্য নেয়ামতের মাধ্যমে আমাদের অনুগ্রহ করেছেন। সকল কৃতজ্ঞতা তাঁরই জন্য, যিনি তাঁর অগণিত অনুগ্রহ ও দান দ্বারা আমাদের সিক্ত করেছেন। এছাড়াও বিশ্বজগতে তিনি যে সকল নিদর্শন স্থাপন করেছেন, বিশেষ করে তিনি যে মহান দানসমূহ দ্বারা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন তার জন্য তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি।

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর সত্তা ও গুণাবলিতে তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল ও সর্বশেষ প্রেরিত নবী। মহান আল্লাহ তাঁর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন, ছাহাবীগণ ও তাঁর নেককার সহচরদের উপর শান্তি ও বরকত অবতীর্ণ করুন।

অতঃপর, নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর বাণী আর সর্বোত্তম পথনির্দেশ হলো মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথনির্দেশ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে বিদআত বা নবসৃষ্ট বিষয় আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমি আপনাদের আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি। আমি আপনাদের তাক্বওয়ার উপর অবিচল থাকা, নিজের নফসের হিসাব নেওয়া এবং প্রবৃত্তির বিরোধিতা করার উপদেশ দিচ্ছি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেকেই চিন্তা করে দেখুক, আগামীকালের জন্য সে কী (পুণ্য কাজ) অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি খবর রাখেন’ (আল-হাশর, ৫৯/১৮)।

হে মানুষ! পানি আল্লাহর মহান নেয়ামতসমূহের মধ্যে অন্যতম। কারণ এটি প্রতিটি জীবিত সত্তার সৃষ্টির মূল উপাদান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম’ (আল-আম্বিয়া, ২১/৩০)।

পানি হলো জীবনের ভিত্তি এবং পরিবেশের সেই উপাদান, যা সকল সৃষ্টির প্রয়োজন, যা ছাড়া মানুষ, পশু ও উদ্ভিদ কিছুই টিকে থাকতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন যাতে আছে তোমাদের জন্য পানীয় আর তাতে জন্মে বৃক্ষলতা, যা তোমাদের পশুগুলোকে খাওয়াও। তিনি তা দিয়ে তোমাদের জন্য জন্মান শস্য, যায়তূন, খেজুর, আঙুর ও সর্বপ্রকার ফল। এতে চিন্তাশীল মানুষদের জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (আন-নাহল, ১৬/১০-১১)।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! পানি হলো পবিত্রতার মাধ্যম আর পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। পবিত্রতা ছালাত ও বহু ইবাদতের পূর্বশর্ত। আমরা পানির মাধ্যমেই ওযূ ও গোসল সম্পন্ন করি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই তাঁর (বৃষ্টিরূপী) অনুগ্রহের পূর্বে সুসংবাদ হিসেবে বায়ু পাঠিয়ে দেন আর আমি আকাশ থেকে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করি। যা দিয়ে আমি মৃত যমীনকে জীবিত করে তুলি এবং তৃষ্ণা নিবারণ করি আমার সৃষ্টির অন্তর্গত অনেক জীবজন্তুর ও মানুষের’ (আল-ফুরক্বান, ২৫/৪৮-৪৯)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর তিনি আকাশ হতে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলেন তোমাদেরকে তা দিয়ে পবিত্র করার জন্য’ (আল-আনফাল, ৮/১১)।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! বৃষ্টি হলো আল্লাহ তাআলার অন্যতম মহান নেয়ামত, যা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে অপরিহার্য করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা নিরাশ হয়ে পড়লে তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন। আর তিনিই তো অভিভাবক, প্রশংসিত’ (আশ-শূরা, ৪২/২৮)।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা বৃষ্টির জন্য নির্দিষ্ট সময় ও পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন এবং তার জন্য একটি প্রতীক্ষিত মৌসুমও রেখেছেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখ না আল্লাহ মেঘমালাকে চালিত করেন, অতঃপর সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন, অতঃপর সেগুলোকে স্তূপীকৃত করেন, অতঃপর তুমি তার মধ্য থেকে পানির ধারা বের হতে দেখতে পাও, অতঃপর তিনি আকাশে স্থিত মেঘমালার পাহাড় থেকে শিলা বর্ষণ করেন, অতঃপর তিনি যাকে ইচ্ছে তা দিয়ে আঘাত করেন আর যার কাছ থেকে ইচ্ছে তা সরিয়ে নেন। তার বিদ্যুতের চমক দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়’ (আন-নূর, ২৪/৪৩)।

হে মানুষ! যখন বৃষ্টি হতে দেরি হয়, তখন মানুষের উপর ভয় ও বিপদের চাপ বেড়ে যায়, দুর্ভিক্ষ ও কষ্ট নেমে আসে, ফসল ও গাছপালা নষ্ট হয়ে যায় আর ঝরনা ও কূপগুলো শুকিয়ে যায়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, তোমরা ভেবে দেখেছ কি যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভের তলদেশে চলে যায়, তাহলে তোমাদেরকে কে এনে দেবে প্রবহমান পানি?’ (আল-মুলক, ৬৭/৩০)।

পূর্বের যুগে নবীগণের উপস্থিতিতেই মানুষের উপর দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল। তারা মানুষকে এর ক্ষতি ও বিপদ থেকে বাঁচার পথ দেখিয়েছেন। এমনকি মহান আল্লাহ কিছু জাতিকে বহু বছরের দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফসলের ঘাটতির মাধ্যমে পাকড়াও করেছেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে দু‘আ করেছিলেন, যেন তিনি তাঁর উম্মতকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস না করেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর সে প্রার্থনা কবুল করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি পাকড়াও করেছি ফেরাউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষ ও ফল-ফলাদির ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৩০)।

আর যখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য কল্যাণ চান, তখন রহমত নেমে আসে। অতঃপর বৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বান্দাদের সাহায্য করেন, যাতে জনপদ সিক্ত হয়। এতে পৃথিবী তার শোভা ধারণ করে ও সজ্জিত হয়, আনন্দের সুসংবাদ প্রকাশ পায় এবং তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! নেয়ামতের শোকর আদায় করা ফরয আর এর কারণেই নেয়ামত অব্যাহত থাকে এবং স্থায়ী হয়। আর এসব নেয়ামতের প্রতিদান হিসেবে সত্যিকারের প্রশংসা ও খাঁটি আনুগত্য প্রদর্শন করাই হলো এসব নেয়ামতের পূর্ণ শোকর আদায় করা। কেননা নেয়ামতের শোকর আদায় করা হলে তা স্থায়ী হয় এবং বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হলে তা কেড়ে নেওয়া হয় এবং বন্ধ হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব। আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’ (ইবরাহীম, ১৪/৭)।

অতএব, আপনারা আল্লাহকে স্মরণ করুন, তিনি আপনাদের স্মরণ করবেন। তাঁর নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য তাঁর শোকর আদায় করুন, তাহলে আল্লাহ আপনাদেরকে আরো বৃদ্ধি করে দেবেন। কাজেই আসুন! আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি তাঁর সর্বময় মহান রহমতের জন্য, যার কল্যাণ সর্বত্র বিস্তৃত। রহমতের বৃষ্টি প্রয়োজনের সময়ে বর্ষণ হওয়ায় শস্যসমূহ সজীব হয়েছে এবং অন্তরসমূহ আনন্দিত হয়েছে। অতএব, আমরা তাঁর নিকট তাঁর অনুগ্রহের স্থায়িত্ব কামনা করি।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের প্রমাণ হলো, বান্দা সকল নেয়ামতকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করবে, তাঁর আনুগত্য করার মাধ্যমে সেগুলোর প্রতিদান দিবে এবং সেই নেয়ামতগুলোকে আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক কাজে ব্যয় করবে। এছাড়াও বান্দার উচিত এসব নেয়ামতকে আল্লাহর কাছে তওবা ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের কারণ বানানো। আর এ নেয়ামতকে পাপ ও অবাধ্যতা পরিত্যাগ করে তাঁর কাছেই ফিরে আসা এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার করার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা জরুরী। কেননা নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের কারণেই নেয়ামত স্থায়ী হয়, বরকত নাযিল হয় এবং তাঁর পক্ষ থেকে বৃষ্টি নেমে আসে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল। (তোমরা তা করলে) তিনি অজস্র ধারায় তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তোমাদেরকে ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদীনালা’ (নূহ, ৭১/১০-১২)।

হে লোকসকল! নিশ্চয়ই বৃষ্টি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত এক মহান নিদর্শন, যা তাঁর অপরিসীম ক্ষমতা ও কার্যকর প্রজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বৃষ্টি নাযিলের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও উপদেশ আর এতে আছে এক ঈমানী বার্তা, যা অন্তরকে জাগ্রত করে এবং মৃত্যু, ধ্বংস, পুনরুত্থান, হিসাব ও প্রতিদান দিবসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অনুর্বর ভূমিতে বৃষ্টি যে জীবন সঞ্চার করে, তা মৃত্যুর পর জীবনের সঞ্চার, শুষ্কতার পর উদ্ভিদ জন্মানো, কঠোরতার পর সচ্ছলতা আসার এক স্পষ্ট ও বাস্তব প্রমাণ, যা আমাদেরকে মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেননা যে ভূমি আগে ছিল নিস্তেজ ও অনুর্বর; বৃষ্টির ফলে সেটিই আন্দোলিত হয়, স্ফীত হয় এবং সব রকমের মনোমুগ্ধকর উদ্ভিদ উৎপন্ন করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর আরেকটি নিদর্শন হলো এই যে, তুমি যমীনকে দেখতে পাও শুষ্ক-অনুর্বর, অতঃপর যখন আমি তার উপর পানি বর্ষণ করি, তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। নিশ্চয়ই যিনি যমীনকে জীবিত করেন তিনি মৃতদেরও জীবিতকারী। নিশ্চয় তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’ (ফুছছিলাত, ৪১/৩৯)।

بارَك اللهُ لي ولكم في القرآن العظيم، ونفعني وإيَّاكم بما فيه من الآيات والذِّكْر الحكيم.

দ্বিতীয় খুৎবা:

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য তাঁর অসীম অনুগ্রহের কারণে। আর তাঁর দান ও তাওফীক্বের জন্য তাঁরই প্রতি কৃতজ্ঞতা। অতঃপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি, তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি, তাঁর ছাহাবীগণের প্রতি এবং তাঁর অনুসারী ও সাহায্যকারীদের প্রতি।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! অনেক মানুষ ছুটি ও অবকাশের সময় প্রকৃতি, বনভূমি কিংবা উদ্যানসমূহে সময় কাটাতে সফরে বের হতে আগ্রহী হয়। একজন মুসলিমের জন্য জরুরী হলো সফরে বের হওয়ার সময় অবকাশ যাপনের শারঈ বিধানসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং সংশ্লিষ্ট আদব-আখলাক মেনে চলা।

সফরে বের হওয়ার ‍গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান ও আদব হলো পরিবারের সদস্যদের বিদায় জানানো, বাহনে আরোহণ করা এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দু‘আ পড়া। যেমন- ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথাও সফরের উদ্দেশ্যে তাঁর উটে আরোহণের সময় তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন, এরপর এই দু‘আ পাঠ করতেন, سُبْحَانَ الَّذِى سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِى سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَاطْوِ عَنَّا بُعْدَهُ اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِى السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِى الأَهْلِ اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوءِ الْمُنْقَلَبِ فِى الْمَالِ وَالأَهْلِ ‘পবিত্র মহান সেই সত্তা, যিনি একে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফরে আমরা তোমার নিকট কল্যাণ, তাক্বওয়া ও তোমার সন্তুষ্টি রয়েছে এমন কাজের তাওফীক্ব চাই। হে আল্লাহ! আমাদের এ সফর আমাদের জন্য সহজ করে দাও এবং এর দূরত্ব কমিয়ে দাও। হে আল্লাহ! তুমিই (আমাদের) সফরসঙ্গী এবং পরিবারের তত্ত্বাবধানকারী। হে আল্লাহ! তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি সফরের কষ্ট, দুঃখজনক দৃশ্য এবং ফিরে এসে সম্পদ ও পরিবারের ক্ষতিকর পরিবর্তন থেকে’। এরপর তিনি যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখনও উপরিউক্ত দু‘আ পড়তেন এবং এর সাথে যোগ করতেন,آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ ‘আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী এবং আমাদের প্রতিপালকের ইবাদতকারী ও প্রশংসাকারী’।[1]

সফরের আদবসমূহের মধ্যে আরো হলো সৎ সঙ্গী নির্বাচন করা এবং একা একা ভ্রমণ না করা। কেননা সৎ সঙ্গী আল্লাহর আনুগত্যের জন্য সহায়ক হয় এবং শয়তান ও পদস্খলন থেকে রক্ষা করে। যেমন- ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যদি লোকেরা একা সফরে কী ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি; তবে কোনো আরোহী রাতে একাকী সফর করত না।[2]

এছাড়াও সফরের আদবের মধ্যে রয়েছে ফরয ইবাদতসমূহ নির্ধারিত সময়ে যথাযথভাবে আদায় করার প্রতি যত্নবান হওয়া। তবে শরীআত সফরকারীর জন্য রুখছত দিয়েছেন, যদি তার সফর কছরের দূরত্বের পরিমাণ হয়, তাহলে সে চার রাকআতের ছালাত ক্বছর করতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছালাত একত্রে (জমা) আদায় করতে পারবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তোমরা যমীনে সফর করবে, তখন তোমাদের ছালাত কছর করাতে কোনো দোষ নেই’ (আন-নিসা, ৪/১০১)। অনুরূপভাবে শরীআত মোজার উপর মাসাহ করার অনুমতি দিয়েছে, মুক্বীমের জন্য এক দিন এক ও রাত, আর মুসাফিরের জন্য তিন দিন ও তিন রাত। তবে শর্ত হলো সে যেন পূর্ণ পবিত্রতার অবস্থায় সেগুলো পরিধান করে থাকে। আর যে ব্যক্তি অসুস্থতা বা এমন কোনো অক্ষমতার কারণে পানি ব্যবহার করতে অক্ষম হয় অথবা তীব্র শীতের কারণে পানি ব্যবহারে ক্ষতির আশঙ্কা করে, তার জন্য শরীআত তায়াম্মুম করার অনুমতি দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাক অথবা যদি তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে অথবা তোমরা যদি স্ত্রী সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও; তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো। সুতরাং তোমাদের মুখ ও হাত তা দ্বারা মাসাহ করো’ (আল-মায়েদা, ৫/৬)।

আর শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের মধ্যে আরো রয়েছে ভ্রমণকারীদের কষ্ট না দেওয়া এবং বিরক্ত না করা। তাদের সম্মান ও গোপনীয়তার প্রতি দৃষ্টি সংযত রাখা, তাদের ব্যক্তিগত বিষয় থেকে বিরত থাকা, তাদের চলাচলের রাস্তা ও পথঘাটে দাঁড়িয়ে বাধা সৃষ্টি না করা এবং এ উদ্দেশ্যে নির্ধারিত জনসাধারণের সুবিধা, সরঞ্জাম ও সেবাসমূহ নষ্ট না করা।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে হেদায়াত দান করুন। আমাদের অন্তরে ঈমানকে প্রিয় ও শোভিত করে দিন। কুফর, অবাধ্যতা ও পাপকে আমাদের কাছে অপছন্দনীয় করে দিন আর আমাদেরকে সঠিক পথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন- আমীন!

 [1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪২।

 [2]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৯৮।


আভাস মাল্টিমিডিয়া

Fonuder & Director: Kaji Asad Bin Romjan Head Office: The Holy Quran Islamic School Kalitola, Sadar, Dinajpur, Bangladesh. Call: 01710-649751 ই-মেইল: avasmultimedia@gmail.com
কপিরাইট © ২০১৯-২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত আভাস মাল্টিমিডিয়া
বৃষ্টি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত -আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ
0:00 0:00
1.0x